আপডেট :»Saturday - 23 September 2017.-
  বাংলা-
পুরানো সংখ্যা খোঁজ করুন »

কুয়েত থেকে রেমিটেন্স হ্রাসের একটি কারন ভিসার মূল্য পরিশোধ

ভিসা দূতাবাসের সত্যায়িত বাধ্যতামুলক, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করন।

কয়েক বছর পূর্বেও কুয়েতের অলিতে গলিতে অনেক বাংলাদেশী শ্রমিক পেপসি ক্যান টুকাতে দেখা যেত। স্বল্প বেতনে সংসারের চাপ কুলাতে না পেরে অনেক প্রবাসী বেছে নিত অন্যায়ের পথ। কথায় আছে অভাবে সভাব নষ্ট তারই আছর পরে বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জরিয়ে কুয়েতে অপরাধের তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকাতে দীর্ঘ প্রায় দশ বছর কুয়েতে বাংলাদেশের শ্রমিক নিয়োগে বাধা ছিল। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি ও কুয়েত সরকারের আন্তরিকতায় এবং কিছু প্রবাসী বাংলাদেশীর সহযোগিতায় কুয়েতে বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগের পক্রিয়া আবার শুরু হয়। বছর দুইয়ের মধ্যে অর্ধলক্ষ বাংলাদেশী শ্রমিক নতুন ভিসায় কুয়েতে আসে ধারনা করা হচ্ছে। প্রথম অবস্থায় তিন থেকে সারে তিন লাখ টাকা খরচ দিয়ে কুয়েত আসলেও বর্তমানে খরচ সাত লাখের উপরে দাড়িয়েছে। কুয়েতে শ্রমিক প্রেরণে বর্তমানে সুনির্দৃষ্ট কোন নীতিমালা না থাকায় অথবা থাকলেও যথাযথ প্রয়োগ না থাকার কারণে হাত বদলের পালায় পরে ভিসার মূল্য এখন আকাশচুম্বী হতে যাচ্ছে। রাতারাতি পয়সা ওয়ালা হওয়ার আশায় কিছু প্রবাসী মধ্যস্ততাকারী হিসেবে কাজ করছেন। তাদের অনেকেই জানেন না কোন কোম্পানির ভিসা বাহির হচ্ছে, কোথায় বা কি কাজ্, বেতন কত। সঠিক তথ্য না জেনে পরিচিত বিভিন্ন জনের কাছ থেকে পাসপোর্ট এবং টাকা সংগ্রহ করেন জমা দিচ্ছেন আরেক জনের কাছে। এই চক্রাকারে অনেক মধ্যস্ততাকারী ও সাধারণ মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। ক্রেতারা ভিসা নিয়ে টাকা পরিশোধ করার পর জানতে পারে ঐ ভিসা বাতিল করা হয়েছে এই নিয়ে কত ধরণের প্রতারনা চলছে ভুক্তভোগিরাই বলতে পারবেন। ভেরিফিকেশন, মেডিকেল চেকআপ সহ পদে পদে প্রত্যেকটি কাজ সারাতে হয়রানির শিকার হন বিদেশগামীরা। কিছুদিন পূর্বে মিডিয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনে হয়রানি হয়। তারা টাকা ছাড়া কাজ করে না। মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টা খতিয়ে দেখবে বলে জানান। অন্যদিকে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানোর জন্য সরকার-নির্ধারিত খরচের চেয়ে বেশি টাকা নিলে সেই প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি। এ ক্ষেত্রে কুয়েত এর ভিসার খরচটা  সরকার কর্তৃক নির্ধারন হলে সাধারন মানুষের হাতের নাগালে থাকত কুয়েতে আসা। ভিসার মূল্য পরিশোধে স্থানীয়ভাবে একটি বড় অংকের এমাউন্ট পাচার হয়। যা রেমিটেন্স ক্ষাতে প্রভাব ফেলে। মজুরী উপার্জনকারী অর্থ প্রেরণকারী নির্বাচিত দেশ কুয়েত বাংলাদেশ ব্যাংক এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে ১১০৬.৮৮ মিলিয়ন ইউএসডি,   ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে ১০৭৭.৭৮ মিলিয়ন ইউএসডি,  ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে ১০৩৯.৯৫ মিলিয়ন ইউএসডি  রেমিটেন্স আয় করে কুয়েত থেকে। এই হিসেবে ২০১৫ সালে ২৯.১ মিলিয়ন, ২০১৬ সালে ৩৭.৮৩ মিলিয়ন ইউএসডি  রেমিটেন্স হ্রাস পায়। এই ধারা এখনো অব্যাহত আছে। অর্থ বছর ২০১৬-২০১৭ জুলাই ৮০.০৩, অর্থ বছর ২০১৬-২০১৭ আগষ্ট ৮৭.৬৯, অর্থ বছর ২০১৬-২০১৭ সেপ্টেম্বর ৭৮.১২, অর্থ বছর ২০১৬-২০১৭ অক্টোবর ৮৭.৭৩, অর্থ বছর ২০১৬-২০১৭ নভেম্বর ৮৫.৮৩, অর্থ বছর ২০১৬-২০১৭ ডিসেম্বর ৮৫.৪৭, অর্থ বছর ২০১৬-২০১৭ জানুয়ারী ৮৪.১৬, অর্থ বছর ২০১৬-২০১৭ ফেব্রুয়ারী ৭৫.৩০, অর্থ বছর ২০১৬-২০১৭ মার্চ  ৮৩.৮০,  অর্থ বছর ২০১৬-২০১৭ এপ্রিল ৮৭.৯৩ মিলিয়ন ইউএসডি রেমিটেন্স যোগ হয় কুয়েতে থেকে। ২০১৬-২০১৭ জুলাই থেকে এপ্রিল অবদি রিপোর্টে দেখা যায় প্রতি মাসে গড়ে ৩.০৫৬ মিলিয়ন ইউএসডি হ্রাস রেমিটেন্স ক্ষাতে কুয়েত উপার্জনকারী দেশ হিসেবে । অনেকের সাথে আলোচনা করে বুঝা যায় কুয়েত থেকে রেমিটেন্স প্রেরনে হ্রাসের কারন হিসেবে তেলের মুল্য বৃদ্ধি, দ্রব্যমুল্যের মুল্যবৃদ্ধি, প্রবাসী শ্রমিকদের ওভারটাইম কমে যাওয়া, আকামা নবায়ন সহ বিভিন্ন ফি কোম্পানিকে পরিশোধ করা রেমিটেন্স ক্ষাতে প্রভাব পরলেও সবচেয়ে বড় প্রভাব ভিসার উচ্চ মূল্য কে দায়ী করেন অনেকে। যেই ব্যক্তি নতুন ভিসা নিয়ে কুয়েত আসেন তার  দুই থেকে প্রায় আড়াই হাজার কুয়েতি দিনার খরচ হয়েছে  কুয়েত আগত অসংখ্য নতুন  প্রবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়। এই খরচের বড় একটি অংশ কুয়েতে পরিশোধ করতে হয়েছে তাদের। এই মূল্য পরিশোধে অবৈধ ভাবে হুন্ডির পথ বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে স্থানীয় আইনে বেতনের বেশি টাকা পাঠানো বাধা থাকাতে হুন্ডি ও বিকাশের মত পথ বেছে নেন প্রবাসীরা। ভিসা ব্যবসায়ের সাথে জরিত অসংখ্য ব্যক্তির সাথে কথা বলে কিছুটা নিশ্চিত হওয়া যায় একটি ভিসা বাহির করতে বাংলাদেশের এক লক্ষ টাকার মত খরচ হয়।  ভিসা ব্যবসার সাথে জরিত মধ্যস্ততাকারী অনেকে যারা মাঠে তীর্ণমুলে ব্যবসা করেন তারা বলেন হাতে গনা কয়েক জনের সিন্ডিকেট করে এর মুল্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। প্রবাসীরা মনে করেন সরকার এখনি যেন একটি যুগপযোগি পদক্ষেপ নিয়ে এই সিন্ডিকেট চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের। হুমকির সম্মুক্ষিন কুয়েতে বাংলাদেশের শ্রম বাজার রক্ষায় সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ  নেয়া প্রয়োজন মনে করেন দেশ প্রেমিক প্রবাসীরা। যদিও কুয়েত এর আইনে ভিসা বেচা কেনা একটি দন্ডনীয় অপরাধ। স্থানীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে ভিসা বানিজ্যের সাথে জরিত আটক, কিছু কোম্পানি শ্রমিকদের বেতন ঠিক ভাবে দিচ্ছে না, অনেক কোম্পানির লোকজনের কাজ নেই ইত্যাদি। কথা হলো কুয়েতে ভিসা বিক্রি নিষেধ তা হলে কি কারণে সাত লক্ষ টাকা ভিসার মূল্য?  তথ্যমতে জানা যায় কোন এক কোম্পানিতে ভিসার জন্য এক ব্যবসায়ী কন্টাক করে আসার পর আরেক ব্যবসায়ী ঐ ভিসা কেনার জন্য মূল্য বাড়িয়ে দেয়। অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায় ভিসা বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই ব্যবসার সাথে জরিতরা এর গোপনিয়তা রক্ষা করার চেষ্টা করেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন একজন কন্ট্রাক্ট করলে অন্যজন মূল্য বারিয়ে দেয়। আমাদের প্বার্শবর্তিদেশ ভারত, নেপাল, শ্রিলংকা, ফিলিপাইন এর শ্রমিক এত কম বেতনে আসতে চায় না। শ্রমিক চাহিদা মেটাতে ঐ দেশের শ্রমিকের বিমান ভাড়া পর্যন্ত বহন করে। সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের ভিসার মূল্য সাত লাক টাকা। বাংলাদেশ সরকারে প্রায় সব দেশের ক্ষেত্রে বিদেশে যেতে খরচের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কুয়েত এর বিষয়টা অতি শিগ্রই সরকারের নজরে আসা দরকার। সম্প্রতি কিছু ঘটনা শোনা যায় দূতাবাস ও এর সত্যতা শিকার করেছে যে কয়েকটি কোম্পানিতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের আকামা (ওয়ার্ক পার্মিট) হয়নি। এদের মধ্যে দশ মাস হয়েছে এমন শ্রমিকও আছে। তাছারা কিছু শ্রমিক নিয়মিত বেতন পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে হয়ত বিগত দিনের চিত্র আবার কুয়েত প্রবাসী বাংলাদেশীরা দেখতে পাবেন। কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস কেন সকল মিশনই অনেক শক্তির অধিকারী কারণ দূতাবাস দু দেশের সরকারের সহযোগিতা পায়। তারা ইচ্ছা করলে যে কোন অপরাধীকে সহজেই চিহ্নিত করতে পারে এবং শান্তির ব্যবস্তা করতে পারে। কুয়েতে শ্রম আইনে একজন শ্রমিক দৈনিক আট ঘন্টা সাপ্তাহে ছয়দিন কাজ একদিন ছুটি। ওভার টাইম করলে প্রতি ঘন্টায় সোয়া এক ঘন্টার হিসেবে পারশ্রমিক দেয়ার নিয়ম। কুয়েত শ্রম আইন অনুযায়ি কুয়েতে প্রত্যেক শ্রমিকের বেতন মাস শেষে ব্যাংকের মাধ্যমে কোম্পানিকে পরিশোধ করা বাধ্যতা মুলক। কুয়েত শ্রম আইনের অনুচ্ছেদ তিন এর ৭০ ধারায় বছরে ৩০ দিন বেতন সহকারে ছুটি পাইবে।  অসুস্থ্য হলে ৬৯ ধারা ২৪ অনুচ্ছেদ উল্লেখ্য একজন কর্মী প্রথম ১৫ দিন পূর্ণ বেতন পাইবেন, পরের ১০ দিন বেতনের তিন চতুর্থাংশ, তার পরের ১০ দিন বেতনের অর্ধেক, এর পরের ১০দিন কোয়ার্টার বেতন এর পরের ৩০ দিন বিনা বেতনে চিকিৎসকের প্রতিবেদন উপর বিত্তিতে ছুটি কাটাইতে পারবে। শ্রমিক সুবিদার্থে কুয়েত সরকার অনেক আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। একজন শ্রমিকের ন্যায্য পাওয়া আদায়ের লক্ষে কঠোর। অনেকে আইন না জানার কারনে যেমন বঞ্চিত হচ্ছে তাদের পাওনা। অন্যদিকে কিছু কর্মকর্তা তাদের এই পাওনা অন্য ভাবে তুলে নিচ্ছে নিজ ক্ষমতা গুনের বলে। শ্রমিকদের পাওনা ও সমস্যা সমাধানে দূতাবাসের করনীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে দূতাবাস কর্মকর্তারা বলেন তারা শ্রমিকদের যে কোন  সমস্যা স্থানীয় আইন অনুযায়ী সমাধানের চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে দূতাবাস থেকে সত্যায়িত করে ভিসা নিয়ে যে সকল শ্যমিক কুয়েত এসেছেন তাদের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা হলে ঐ কোম্পানীর বিরোদ্ধে যে কোন পদক্ষেপ সহজে নিতে পারে দূতাবাস, কারন তারা কোন ভিসা সত্যায়িত করার পূর্বে ঐ কোম্পানির সুযোগ সুবিধা বাসস্থান সহ যাবতিয় বিষয় সম্পর্কে খুজঁ খবর নেন। সে কারনে খুব সহজেই এর সমাধান দিতে পারেন। বড় সমস্যা হয় যে সকল শ্রমিক কুয়েতস্থ দূতাবাসের সত্যায়িত ব্যতিত বাংলাদেশ থেকে চলে আসেন সেই সব শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে তেমন একটা জোর ক্ষমতা চালাতে পারেন না দূতাবাস। বিদেশে শ্রমিক প্রেরনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ভিসা দূতাবাসের সত্যায়িত বাধ্যতামুলক করে যে কোন সমস্যায় দূতাবাসের জবাব দিহীতা সরকার কর্তৃক মনিটরিং ও জবাব দিহিতা নিশ্চত করলে হয়ত কিছুটা লাগব হবে বলে সাধারন প্রবাসীরা মনে করেন।

 

 

লেখকঃ প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক মঈন উদ্দিন সরকার সুমন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*