Home / সাহিত্য / নজরুল: অভিশাপ ও আশীর্বাদ

নজরুল: অভিশাপ ও আশীর্বাদ

মজিদ মাহমুদ- কবি হিসেবে অভিশাপ ও আশীর্বাদ নজরুল-জীবনে অবিমিশ্র ছিল না। হিন্দু ব্রাহ্মণ ও মুসলমান মৌলবী, বিদেশী রাজা আর দেশী রাজ-কর্মাচারী এ ব্যাপারে প্রত্যেকে ছিলেন একাট্টা। নজরুল ভিন্ন বাংলা ভাষাভাষীদের আর কোনো অভিজ্ঞতা নেই যে— শুধু কবিতা লিখবার দায়ে একজন মানুষ কি পরিমাণ নিন্দিত ও নন্দিত হতে পারেন। গ্রিক মিথোলজির অমরতার পুত্র প্রমিথিউসের মতো সারাদিন শকুনিরা তাঁর মাংস খুবলে খেতো আর রাতে তিনি নিজেকে শিল্প-মাংসে সংগঠিত করে তুলতেন প্রাতে পুনরায় শকুনির ভোজের নিমিত্তে। কিন্তু স্বর্গের আইন ভঙ্গ করে অসহায় মানুষের জন্য দেবতাদের সংরক্ষিত যে আগুন তিনি চুরি করে এনেছিলেন তা ছড়িয়ে পড়েছিল দিগ্বিদিক— রুটির দোকানের শিশু-শ্রমিক থেকে লেটোগানের আসর ছাড়িয়ে তা পৌঁছে গিয়েছিল ‘সভ্যের বর্বরলোভ’ থেকে মুক্তিকামী প্রতিটি অসহায় মানুষের হৃদয়ে— সে আগুন ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা ছিল না সাগর পারের ঔপনিবেশিক প্রভু ও তাদের টাইটানদের। তাই এই ‘বিদ্রোহী ভিগু’র জন্য ছিল তাদের অভিশাপ আর অবিরত শাস্তি।

নজরুলের সক্রিয় জীবনকাল শেষ হয়েছে প্রায় পৌনে একশত বছর আগে। কিন্তু প্রয়াত নজরুল ও নজরুল-সাহিত্যের জন্য পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে সামান্য। বরং তাকে বর্জন ও গ্রহণের নানা রকম রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়ায় এখন কোনটি যে আসল নজরুল তা ঠাহর করা দুরূহ। যে সব রাজনৈতিক বিবেচনায় নজরুল তাঁর সমকালে নিন্দিত ও নন্দিত ছিলেন— নির্বাক ও প্রয়াত নজরুলযুগে তার ধরন-ধারণ সম্পূর্ণ পাল্টেছে। নজরুল যে সব বিষয় নিয়ে যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন আজ তারা হয়ে উঠেছেন নজরুলের অন্যতম প্রধান দাবিদার। আর যে শ্রেণী নজরুলকে সেদিন অভিনন্দন জানিয়েছিলেন নজরুলের ভাষাকে যারা শৃঙ্খলিত মানবতার বাণী বলে চিনতে পেরেছিলেন তাদের অনেকেই আজ নজরুল-বিচারে বিভ্রান্ত।

তবে আমার এই আলোচনাকে একটি সরল-রৈখিক মন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকি রয়েছে অনেক। কারণ দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষাপটে বদলে গেছে দিগন্ত রেখা, পাল্টে গেছে জীবনযাত্রার পর্ব ও মাত্রার সেদিনের অন্বয় ও অনন্বয়। উপকরণ ও অন্তকরণে ঘটে গেছে নানা পরিবর্তন। যে বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে নজরুল তার প্রতিভার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন সেই ইংরেজ আজ বিগত; কিন্তু শাসকের চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয় সহজ নয়। নজরুলের দিক থেকে এই পরিবর্তন তীব্র বৈশিষ্ট্যসূচক এই কারণে যে, জীবিত নজরুলের সৃষ্টিশীলতায় তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার সন্ত্রস্ত ও অতিষ্ট হয়ে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল এবং একের পর এক তাঁর গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করেছিল; অপরদিকে শাসকের চরিত্রের ইতর বিশেষ না হলেও নির্বাক ও প্রয়াত নজরুলকে গ্রহণ ও সম্মান দানে উত্তর-ঔপনিবেশিক কালের শাসকগোষ্ঠি এককাঠি সরেস। কারণ নজরুল সাহিত্যের ভাষাহীন ও অবমানিতের ভাষা তাদের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠার আগেই নানা রকম অভিধায় কবিকে সিক্ত করে দিচ্ছেন রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ— কখনো তিনি জাতীয় কবি, কখনো মুসলমানের কবি কখনো বা বাঙালির কবি। কিন্তু নজরুলের এসব কিছু হওয়ার পিছনে যে অন্তর-অনুপ্রেরণা, শোষণ ও বঞ্চনাহীন সমাজের ধারণা ক্রিয়াশীল ছিল তার অনেকখানি এই জাঁকজমক ও প্রাতিষ্ঠানিকতার আড়ালে তলিয়ে যায়। তাছাড়া নজরুল হিন্দু ও মুসলমানের যে ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক চেতনার বিনাশ চেয়েছিলেন তা কবির নির্বাক পর্বের প্রথম পর্যায়েই অবসিত হয়— হিন্দু ও মুসলমানের আলাদা দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। অন্নদাশঙ্কর রায়ের বহুকথিত ছড়াটি এই বোধের যথার্থ্য প্রকাশ হতে পারে যে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের নামে ভাগ হয়ে গেলেও একজন বাঙালি এখনো অবশিষ্ট আছেন—
বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান উভয় যাঁর দাবি ছাড়তে নারাজ। যদিও নজরুলের শারীরিক ইন্তেকালের পর তাকে কবরস্থ করার পরে শ্রীমান রায় তার আগের মত প্রত্যাহার করে বলেছিলেন— ‘এতকাল পরে ধর্মের নামে ভাগ হয়ে গেল নজরুল।’ তবু নজরুল চেতনার গুরুত্ব উপলব্ধি করবার এটি একটি উপায় যে বাঙালি প্রাত্যহিক স্বার্থ চেতনায় নিজেদের মধ্যে নানা ঘোট পাকিয়ে তুললেও মানুষ হিসাবে নজরুলের ইতিবাচক চেতনার উত্তরাধিকার তারা অন্তরে ধারণ করতে চায়।

পাকিস্তান এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র কায়েম হওয়ার পর রাষ্ট্র সহজেই নজরুল ও নজরুল রচনা সম্ভার গলাধঃকরণ করতে পেরেছে। নজরুলের কোনো গ্রন্থ আর এখন বাজেয়াপ্তের তালিকায় নেই; কিংবা নজরুলকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করবার সাহস কোনো পক্ষ দেখায় বলে মনে হয় না। তাহলে ফলাফল দাঁড়ায় এমন— নজরুল সাহিত্য বর্তমানে একটি নির্বিষ পৌরুষহীনতায় আক্রান্ত— যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না। এমনকি তরুণ প্রজন্ম— অন্তত তরুণ কবিদেরও উজ্জীবিত করার ক্ষমতা তাঁর সাহিত্য হারিয়ে ফেলেছে। কিংবা নজরুল সাহিত্যে যাচিত রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা চূড়ান্ত প্রাপ্তি লাভ করেছে— যার বিরুদ্ধে কখনো আর কলম ধরতে হবে না। যেন নজরুল সাহিত্যের দায়িত্ব ছিল কেবল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রভাবক হিসাবে ক্রিয়াশীল থাকা। সুতরাং নজরুল কিংবা নজরুল সাহিত্যের গুরুত্ব কেবল ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ থাকা। তাই ইতিহাসের এই বিপ্লবী কবিকে স্মরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; যেহেতু রাষ্ট্র মনে করে থাকে নজরুল যে ধরনের বিপ্লবী-চেতনা পোষণ করতেন সমাসীন সরকারও সেই ধরনের বিপ্লবের ফসল। অথবা অন্যভাবে বলা যায়, নজরুল যেহেতু নিম্নবর্গের কবি অর্থাৎ সাধারণ জনগণের, কমনারের বা ইতরজনের কবি; আর যা সাধারণের তা-ই পাবলিক, যা পাবলিকের তা-ই সরকারী অর্থাৎ পাবলিকের সম্পদের উপর সরকারের ষোলআনা হক আছে। যেহেতু সরকার জনগণের নামে দেশ পরিচালনা করে। সুতরাং যা জনগণের তা-ই সরকারের। নজরুল যেহেতু কমনারদের কবি সেহেতু নজরুলের সরকারে প্রতিষ্ঠা পেতে বেগ পাওয়ার কথা নয়। সে সরকার গণতন্ত্রী, সামরিক-স্বৈরতন্ত্রী কিংবা ধর্ম-পছন্দ হলেও ইতর বিশেষ হবে না। কিন্তু যাদের সম্পদ সরকারের নয়— অর্থাৎ উচ্চবর্গীয় অভিজাত শ্রেণী (অন্তত নিজেদের যারা সেই শ্রেণীভুক্ত মনে করেন), করপোরেট ব্যবসায়ী, বিদেশী কোলেবরেটর— তাদের ড্রয়িং রুমে নজরুলের প্রতিষ্ঠা অবাধ নয়। কারণ তাদের এ কথা ভুললে চলে না যে, পিতার দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান, স্বামীর মৃত্যুর পর যার মা পিতৃব্যকে বিয়ে করেন, মক্তবে আম-ছিপারা পড়া, মায়ে খেদানো বাপে তাড়ানো লেটোদলের ছোকড়া, রুটির দোকানের শিশু শ্রমিক, বাসাবাড়ির কাজের ছেলে, দূরগ্রামে লজিং মাস্টার সর্বোচ্চপদ সেনাবাহিনীর হাবিলদার এবং যার নিজের নাম দুখু মিয়া— সেই কবি— যে কিনা কুলিমজুরের মানবাধিকার চায়, বারাঙ্গনাকে মা বলে সম্বোধন করেন— সর্বোপরি হিন্দুর চতুর্বর্গ আর মুসলমানী আশরাফ-আতরাফের তোয়াক্কা করে না— তার আসন কি করে পাকা হতে পারে ব্রাহ্মণ আর সৈয়দের বসবার ঘরে। এখানে আমার পর্যবেক্ষণ— অভিজাত শ্রেণীর যারা নজরুলকে তাদের কবি বলে অন্তত প্রচার করতে চান তাদের মধ্যে দুই শ্রেণীর লোক আছেন। এক. অভিজাত হলেও যারা তর্কের খাতিরে হলেও জাতপাত ও শ্রেণীকে অস্বীকার করেন— তাদের অধিকাংশ মার্কসবাদী ঘরানার। নজরুল যদিও দীক্ষিত মার্কসবাদী ছিলেন না তবু ভারতবর্ষের প্রথম যুগের মার্কসবাদী কর্মকাণ্ডকে শক্তিশালী করে এমন অনেক কর্মকাণ্ড ও উপাদান নজরুলের মধ্যে হরহামেশা বিরাজমান। দুই. অপর অভিজাত পক্ষ যারা নজরুলকে পছন্দ করেন এই জন্য যে নজরুল তাদের মতো মুসলমান ছিলেন। আর যে কারণে তারা প্রচার করতে পছন্দ করেন নজরুল একটি অভিজাত পরিবার থেকে এসেছিলেন—যারা ছিলেন বাদশা বা নবাবের কাজীউল কুজ্জাত। হয়তো পূর্বপুরুষ পাটনার আগে বাগদাদে ছিলেন। অবশ্য আমার জানা নেই, নজরুলের দাদার দাদা কাজী খেবরাতুল্লা পর্যন্ত তার বংশলতিকার কার কোন পেশা ছিল। বাস্তবতা হলো ব্রিটিশ শাসনের প্রবল অর্থগৃধœু প্রবৃত্তি এবং বৈষম্যের নীতির ফলে আর দশজন সাধারণ বাঙালি মুসলমানের ভাগ্য নজরুল পরিবারকেও বরণ করতে হয়েছিল। সুতরাং বংশ যাই হোক রবীন্দ্রনাথের ভাষায় নজরুল ছিলেন, ‘নেড়ি কুকুরের ট্রাজেডি’ লেখার কবি (ছেলেটা; পুনশ্চ)।

যদিও নজরুলের জন্য মার্কসবাদী হওয়া কিংবা ধর্মীয় প্রকল্প গ্রহণ করার মধ্যে তেমন কোনো তফাত ছিল না; কারণ নজরুল চেয়েছিলেন ভারতবর্ষের শাসন ভারতীয়রা করুক, জাতপাতের দুষ্টগ্রহের অবসান হোক, সমাজের দুর্বল শ্রেণী, নারী ও শ্রমের মূল্য প্রতিষ্ঠা পাক। আর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ধর্মের সাম্যবাদী ও সংঘবদ্ধ হওয়ার চেতনা এবং মার্কসবাদী বণ্টনের ধারণাকে তিনি গ্লোরিফাই করেছেন। যে কারণে কোনো একটি বিশেষ শ্রেণী মত ও পথের লোক নজরুল চেতনার একটি খণ্ডিিত ব্যাখ্যা সহজেই দাঁড় করিয়ে দেন। নজরুলকে প্রচলিত অর্থে কেবল কবি হিসাবে আলোচনার ঝুঁকি রয়েছে। মাইকেল রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দ দাশ কিংবা তার উত্তরসাধকরা যে অর্থে কবি— নজরুল কেবল সে অর্থে কবি নন। কারণ প্রত্যেকে তার জাতপাত ও শ্রেণীর মধ্যে থেকে প্রধানত সৌন্দর্য সৃষ্টির লক্ষ্যে বোধের প্রকাশ সম্পন্ন করেছিলেন। বর্ষাকাল। প্রমত্ত পদ্মা। আকাশ জুড়ে কালো মেঘ। কৃষক আউশ ধান কেটে নৌকা বোঝাই করেছে। কিংবা এসব কিছু ছাড়াই কবির মনের স্পর্শকতরতা ছন্দবদ্ধ বাক্যের জন্ম দিচ্ছে। কিন্তু নজরুল ছিলেন মিশনারী যেমন— মধ্যযুগের সাধক কবি কবীর, নানক কিংবা লালন— যাদের গান দোঁহা কিংবা কবিতা আমাদের মুগ্ধ করে বটে কিন্তু তা রচিত হয়নি কেবল কবির একটি অনুভূতিময় মন আছে বলে। প্রবল ধর্মীয় অনুষঙ্গ সত্ত্বেও তাদের রচনায় যেমন কোনো একটি ধর্মের মাহাত্ম্য বর্ণনা হয়নি, কিংবা তাদের আমলে মার্কসবাদের অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও মার্কসবাদের বহু ইতিবাচক প্রচারণা তার মধ্যেও ক্রিয়াশীল ছিল।বরং তাঁরা নিজেরাই হয়ে উঠেছেন যে কোনো মত ও পথের মতো স্বাতন্ত্র্য একক। যে কারণে তাদের রচনার পাঠকের বাইরেও গড়ে উঠেছে বহু অনুসারী ও পন্থী। যারা বিশ্বাস করে থাকে তাদের গুরুদের প্রদর্শিত পথে রয়েছে প্রকৃত মুক্তি— তা ভাববাদী কিংবা বস্তুবাদী যা-ই হোক না কেন। জীবন যাত্রার পথে নানা বন্ধন অতিক্রম করার উপায় তারা এইসব মহাপুরুষের মধ্যে আবিষ্কার করেন। তারা অনেক সময় নিজেদের মতো করে রচনা করেন তাদের গুরুর জীবন। তাদের সঙ্কীর্ণতা ও মহত্ত্ব আরোপ করেন তার চরিত্রের উপর। তাই কথিত আছে অদৃশ্য কবীরের অন্তিম শয়ান থেকে ফুল নিয়ে হিন্দু অনুসারীরা দাহ করেন এবং মুসলিম অনুসারীরা কবর দেন। নজরুলের জন্যও রয়েছে এ রকম অসংখ্য ভক্ত— যাদের অনেকের পারষ্পরিক অবস্থান ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে। যারা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নজরুল জীবনে নানা প্রক্ষিপ্ত তথ্য সংযোজন করেছে। এ সব তথ্য প্রকৃত নজরুল-পাঠে অন্তরায় হলেও জনগণের কবির জীবনী রচনায় জনগণের অংশগ্রহণ নতুন নয়। এ সত্য যেমন চণ্ডিদাসের জন্য, তেমন শেকসপিয়র ও লালনের জন্য। নজরুলের মতো এমন ক্যারিসমাটিক জীবন নিম্নবর্গের সাধারণ মানুষের জন্য জাদুবিদ্যার মতো সত্য। সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তারা টেলিভিশনের এক কুইজ অনুষ্ঠানে প্রশ্নকর্তার একটি জিজ্ঞাস্য ছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি কে লিখেছেন? কয়েকটি বিকল্পের সঙ্গে একটি ছিল জনৈক ট্রাক ড্রাইভার। প্রথমে একটু খটকা লাগলেও সামলে নিতে কষ্ট হয়নি কারণ পুঁজি ও বর্গের এই সমাজে একজন ট্রাক ড্রাইভারের জন্য কবি থাকা রীতিমত বেমানান— খানিকটা উদ্ভট বটে। সমাজে কবির ধারণা শ্রেনীপাতের ঊর্ধ্বে নয়।

ইতিহাসে বাঙালির কালপর্বে শ্রীচৈতন্য ভিন্ন একজনও পাওয়া যাবে না যিনি তাঁর সমকালে নজরুলের মতো সারা দেশকে ভক্তি ও ভাবে ভাসিয়ে নিতে পেরেছিলেন। নজরুলের সমকালীন সকল ভাষ্যকারের রচনায় তার প্রমাণ মেলে। গৌরাঙ্গের পরিধি কেবল কৃষ্ণপ্রেমে সীমায়িত ছিল। বাঙালি মুসললমানের তাতে অংশগ্রহণের উপায় ছিল কম। কিন্তু খোদা ও নবীপ্রেম; বৈষ্ণব-শাক্ত প্রীতি কোনো অংশ কম ছিল না নজরুলের। বাংলাভাষার ঐতিহ্যের অধিকারীদের তিনি খণ্ডিত করে চিন্তা করেননি। তবে বাঙালিকে তিনি জাগিয়ে দিয়েছিলেন চৈতন্যের মতো ধর্মের ভিত্তিতে নয়। ‘যাঁরা দেখেছেন শুধু তাদেরই বোঝানো যাবে কী দুকূলপ্লাবী আনন্দধারা দিয়ে গড়া’ (প্রতিভা বসু; নজরুল ইসলাম)। ‘দেহের পাত্র ছাপিয়ে সব সময় উছলে পড়েছে তাঁর প্রাণ, কাছাকছি সকলকেই উজ্জীবিত করে, মনের ময়লা, খেদ ও ক্লেদ সব ভাসিয়ে দিয়ে। সব লোকই তার আপন, সব বাড়িই তার বাড়ি। শ্রীকৃষ্ণের মতো, তিনি যখন যার তখন তার।’ (বুদ্ধদেব বসু: নজরুল ইসলাম)। প্রকৃতপক্ষে সারা বংলা নজরুল অবিশ্রান্ত হওয়ার কারণ ছিল পরাধীন দেশের স্বদেশী যুগের অবরুদ্ধ বাণী প্রকাশিত হয়েছিল নজরুলকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সাহিত্যে কৈবল্যবাদীরা তাতে খুশি হতে পারেন নি। একলব্যের মতো কেড়ে নিতে চেয়েছে তাঁর ধনুক চালাবার আঙ্গুল। এমনকি তাঁকে ব্যঙ্গবিদ্রুপে ধরাশায়ী করার জন্য বাঙালির প্রতিভাবান সন্তানদের অনেকেই ‘শনিবারের চিঠির’ মতো পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। সে সব প্রতিভাবান বালকদিগের ভেকের জীবন নিয়ে খেলার পরিণতি জানা ছিল না। ‘আমাদের ছিল স্রেফ খেলা, মোহিতলালের ছিল জীবন-মরণ সমস্যা।’ (সজনীকান্ত দাস)। কিন্তু ‘বলরামের চেলা’ নজরুল এ সব থোড়াই কেয়ার করেছিলেন। যিশুখৃস্টের মতো কণ্টকের মালা তিনি অন্যদের জপমালা করে তুলেছিলেন। বলতে দ্বিধা করেননি— ‘শনিবারের চিঠি’র কৃপায় আমি ত গালির বাগিচায় বাদশাহ।’

অপরদিকে নজরুল ছাড়া আর কোনো কবির রচনাকে বহুমুখী সেনসরের সম্মুখীন হতে হয়নি। বিশেষ করে পাকিস্তান পর্বে নজরুলকে ইকবালের পাশাপাশি জাতীয় কবি করার চেষ্টা করা হলেও প্রচুর হিন্দুয়ানি কবিতা অঙ্গচ্ছেদনের সুপারিশ করা হয়। এই সুপারিশকারীদের অন্যতম প্রধান কবি গোলাম মোস্তফা কিন্তু ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন (অবশ্য ছদ্মনামে), ‘পাকিস্তানের জাতীয় কবি হওয়া দূরের কথা, নজরুল ছিলেন ঘোর পাকিস্তান বিরোধী।’ (মুস্তাফা নূরউল ইসলাম: সমকালে নজরুল)। তবে এ কথাও বলতে হয়, নজরুল বাংলা বা বাঙালির জয় কামনা করলেও গত শতাব্দির বিয়াল্লিশ সালের আগে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব রাষ্ট্র পরিকল্পনার স্বপ্ন দেখার মতো ভবিষ্যৎদ্রষ্টা তিনি ছিলেন না (অবশ্য আর কেউও নন)। তিনি গাহিয়াছিলেন ‘অখণ্ড ভারতে’র গান, তিনি দেখিয়াছিলেন হিন্দু-মুসলিম কৃষ্টির হরগৌরী রূপ। … তিনি ছিলেন আগে ভারতবাসী পরে মুসলমান ’ (গোলাম মোস্তফা : প্রাগুক্ত)। ফলে নজরুল চর্চা সবকালে একই মাত্রায় অগ্রসর হয়নি। সমাজ ও রাষ্ট্রের নবনব গঠন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নজরুল সাহিত্যকে এক শুদ্ধি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগুতে হয়েছে। নজরুল গবেষকদের দিতে হয়েছে নবতর ব্যাখ্যা। এ সব ব্যাখ্যার দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে নজরুল দারুনভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত নজরুলের ছিল না এসব খাপ খাওয়াবার তাড়া। ছিল না নিন্দিত বা নন্দিত হবার আকাঙ্ক্ষা। একজন খাঁটি বিপ্লবীর মতো তিনি একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষের প্রতি ধাবিত হয়েছিলেন। তাঁর গঠন সম্পন্ন হয়েছিল ঔপনিবেশিক ভারতের একজন ভূমিপুত্রের মতো। ‘বিদ্রোহী’র মাধ্যমে তিনি পরাধীন দেশে প্রথম স্বদেশের ভূমির উপর দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক ভূগোল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নজরুল হয়েছে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত ও বিকৃত। যে পরিবর্তিত নজরুলকে রাষ্ট্র কিংবা সংঘ আজ গ্রহণ করছে তার আদি আবির্ভাব কারো জন্য সুখকর নয়। কারণ নজরুল ‘মহাভয়’ ও ‘অভিশাপ পৃথ্বীর।’

এ লেখাতে আমি বলতে চেয়েছি, নজরুল যদি তাঁর কালে নানাভাবে আক্রান্ত হয়ে থাকেন তাহলে এ কালে তাঁর সাহিত্যের অবাধ প্রতিষ্ঠা এ কথা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রের সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধতার অবসান হয়ে বঞ্চনাহীন ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে; কিংবা দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষাপটে নজরুল সাহিত্যের নানা রকম ব্যাখ্যা এবং গ্রহণ ও বর্জনের মাধ্যমে তা কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে।

আরও পড়ুন...

সালাহউদ্দিন সালমানের “পকেট সেলাই করি ছেঁড়া জামার”

শেখ জহির রায়হান, (বাংলার বার্তা) সিঃ করসপন্ডেন্টঃ মহান একুশে বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছে ‘সালাহউদ্দিন সালমানের তৃতীয় …

error: Content is protected !!