Home / সাহিত্য / রবীন্দ্র-নজরুল জন্ম জয়ন্তী ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা -মো: আলী আজম

রবীন্দ্র-নজরুল জন্ম জয়ন্তী ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা -মো: আলী আজম

১৫১তম জন্মজয়ন্তীতে এসেও বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে উদযাপিত বিশ্বকবির সার্ধশত জন্মবার্ষিকীর রেশ বজায় আছে বেশ।  জাতীয় কবি কাজী  নজরুল ইসলামের ১১৩ তম জন্ম জয়ন্তীও  বাংলাদেশÑভারতের যৌথ উদ্দীপনায় উদযাপিত হল এবার । এতে বাড়তি অনুপান বলতে বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশেরও ৯০ বছর। বিশ্বজুড়ে বাঙ্গালি, বাংলাভাষাভাষি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান উৎসাহ উদ্দীপনায় রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী উদযাপনের ক্রমবর্ধমান উৎসাহ দেখে মনে হয় বাঙালির গোলায় গোলায় ধান আর গলায় গলায় গান আবার ফিরে এল বুঝি। বাঙালি এখন মানুষ হয়েছে, ,জাতের নামে বজ্জাতি থেকে মুক্তি পেয়েছে বুঝি ।  অথচ এ’কথাও অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, বাংলাদেশে রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্যকর্ম নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার চেয়ে তাদের নিয়ে সংকীর্ণ রাজনৈতিক টানা-হেঁচড়া হয় বেশী। তাই মনীষীদ্বয়ের যে  দেশাত্ববোধ, জীবনবোধ জাতিকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দিতে পারতো উল্টো সেটাই এখন সংকীর্ণ স্বার্থবুদ্ধির জালে আটকা পড়েছে। গোড়াতেই বলে রাখা ভাল- চির মনোরম চির মধুর যে বাংলাকে নমস্কার জানিয়েছেন বিদ্রোহী কবি, যার বদনখানি মলিন হলে রবীন্দ্রনাথ নয়ন জলে ভাসেন সেই বাংলার ভৌগলিক সীমানা আজকের বাংলাদেশের রাষ্ট্রসীমার চেয়ে অনেক বেশী প্রসারিত। ১৯০৫ সনে ইংরেজদের ভেদবুদ্ধি জনিত বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতায় রবীন্দ্রনাথের বাউল সুরে লেখা গান আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। আর বিদ্রোহী কবি নজরুল  ১৯৪০’এ পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধীতায় সাপ্তাহিক যুগান্তরে নিজের সাক্ষরিত সম্পাদকীয় “পাকিস্তান না ফাঁকিস্তান” লিখে চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হয়ে শেষাবধি পিটে সেই ক্ষতচিহ্ন নিয়ে মসজিদের পাশে সমাহিত হয়েছেন । সোজা কথায় প্রশাসনিক বিভাগ কিংবা আজাদীর নামে তাঁরা কেউই বঙ্গভঙ্গ না চাইলেও রাজনীতি তাঁদের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে গেছে, উল্টে দিয়েছে।  দেশে দেশে রাজনীতি পছন্দসই কবিতা, শ্লোগানকে যত বেশী ধারন করতে চায় কবির স্বপ্ন , বিশ্বাসকে ততটাই নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখতে ভালবাসে। রবীন্দ্র-নজরুলকে নিয়ে  ভালবাসা এবং ভালবাসা জড়ানো দ্বিমুখীনতা,স্ববিরোধীতার প্রেক্ষাপট বাঙ্গালি জাতির উত্থান এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার সমবয়সী এবং সমান্তরাল। এই বিষয়ে বিশদ বর্ণনায় যাওয়ার আগে মনীষীদ্বয়ের জীবনচিত্রের উপর দ্রুত চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।

কোলকাতার জোড়াসাঁকোর রবীন্দ্রনাথ আর বর্ধমানের চুরুলিয়ার নজরুল : অখন্ড ভারতবর্ষের অবিভক্ত বাংলার এই দুই এজমালি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে পদ্মাপাড়ের বাঙালির বাংলাদেশের আত্মানুসন্ধান এবং আত্মপ্রতিষ্টা।অব্যাহত অগ্রযাত্রায় বরাভয়েরও প্রতীক। বিশ্বকবি এবং বিদ্রোহী কবি এই বাহ্যিক পরিচয়ে দু’জনেরই প্রতিষ্টা অবিভক্ত ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কোলকাতায় হলেও তাঁদের আত্মিক পুষ্টি হয়েছিল পূর্ব বাংলার রূপ-রস-গন্ধে, পিছিয়ে পড়া মানুষের মধ্যে।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জীবিত সন্তানদের মধ্যে ত্রয়োদশ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালে কোলকাতায়। পিরালির দায় নিয়ে যশোরের  ভদ্রাসন ছেড়েছিলেন বিশ্বকবির  আদি পুরুষগণ।  নানার বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ি খুলনায়।। ওরিয়েন্টাল সেমিনারীতে প্রাথমিক শিক্ষার্থে ভর্তি হলেও তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মুলত: গৃহ শিক্ষকদের তত্বাবধানে।।   কৈশোরে মাতৃহারা কবি বেড়ে উঠেছেন জোড়াসাকোর অভিজাত সাংস্কৃতিক পরিবেশে, ঊনিশ শতকের বাংলা রেনেসার মুক্ত হাওয়ায়, ধর্মীয় গোড়ামিমুক্ত উদারমনা ব্রাক্ষ্ম সমাজে। শাাজাদপুর,  শিলাইদহে পৈতৃক জমিদারী দেখাশোনা করতে এসে মাটি ও মানুষের সান্নিধ্যলাভ এবং তাদের জীবন ঘনিষ্ট হওয়া। প্রজাদের দু:খ কষ্ট লাঘবে ক্ষুদ্র ঋণ ভিত্তিক কো অপারেটিভ তথা  সমবায় ব্যাংক, দুগ্ধ খামার প্রতিষ্ঠা, কৃষকদের মধ্যে উন্নত কৃষি বীজ, উপকরনের প্রচলন, সাবান-ছাতা ইত্যাদি তৈরীর কুঠির শিল্প , মৎস্যজীবিদের জন্যে খাজনামুক্ত বিল-জলা প্রদান ইত্যাদি সমাজ চিন্তার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটে এই মাটিতে। ছোট ছোট মানুষের অসামান্য জীবনবোধ, জীবন চর্চা এবং মানবিক আকুতি এখানেই চিত্রায়িত করেন ছোটগল্পের রবীন্দ্রনাথ।  নদীমাতৃক এই বাংলাদেশেই বিশ্বপরিভ্রাজক রবীন্দ্রনাথের কবিচিত্তের সোনার তরীতে অধিষ্ঠিত হন আপন দেবতা ।  ঋতুচক্রে এখানকার নদী-নিসর্গ এবং তাকে ঘিরে মুখর নির্জনতায় জীবনের কোলাহলে চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা “আমি কোথায় পাব তারে” নুতন এক মাত্রা এমনকি এক কথায় উত্তর ও পেয়ে যায় বাউল রবীনদ্র উচ্চারনে- আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি ।

রবীন্দ্রনাথের লেখা গান বাংলাদেশ ও ভারত প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে। শ্রীলংকার জাতীয় সঙ্গীত “শ্রীলংকা মাতা” সম্পর্কেও বলা হয় শান্তি নিকেতনের ছাত্র আনন্দ সামারাকুনের অনুরোধে  তিনি তা লিখে দিয়েছিলেন। ১৯৫১ সনে তা সিলোনের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়। জাতীয় সঙ্গীতের বাইরেও বিশেষত: সাধারণ বাঙ্গালির নাগরিক জীবনে ঋতু ভিত্তিক উৎসব আনন্দে, দু:খ শোকে রবীন্দ্রনাথের অনেক গান,শ্লোক রীতিমত প্রবাদ কথার মত আবশ্যকীয় উচ্চারণে পরিণত হয়েছে।

প্রথম অ ইউরোপীয় কবি হিসেবে ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলীর জন্যে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর এই আন্তর্জাাতিক স্বীকৃতির সূত্র ধরে বহির্বিশ্বে উপমহাদেশীয় জীবন দর্শন, সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতার মুখপত্র হয়ে উঠে বাংলা ভাষা এবং বাঙ্গালি জাতি। তাঁর কবিতা ও গান, সমাজ চিন্তা ও দর্শন বিশ্বের প্রায় সবগুলো নেতৃস্থানীয় ভাষায় তো বটেই দূরপ্রাচ্য, ল্যাটিন আমেরিকা, সাব-সাহারার অনেক অল্প পরিচিত ভাষাতেও অনূদিত হয়ে চলেছে। তাঁর চিন্তা চেতনায়  প্রভাবান্বিত হয়েছেন সমকালীন বিশ্বের যশস্বী বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং কবিতায়  গ্যব্রিয়েল মার্কেজ, অক্টাভিও পাজের মত খ্যাতনামা কবিগন । কবি প্রতিষ্ঠিত শান্তি নিকেতন আজও  শিল্প-সাহিত্য-দর্শনে পূর্ব-পশ্চিমের সাংস্কৃতিক যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

জীবনের সমান বিস্তৃত বিশ্বকবির কবি জীবন, কর্ম জীবন। শুরুটা হয়েছিল আট বছর বয়সে ভানু সিংহ নামে আর ব্যপ্ত ছিল আগস্ট ১৯৪১ সালে মৃত্যুর সপ্তাহখানেক আগ পর্য্যন্ত । স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে প্রকৃতি ও জীবনের তেমন কোন রূপ-রস-গন্ধ অনুভ’তি আছে কিনা সন্দেহ যা রবীন্দ্র ভাবনায় ধরা দেয়নি কিংবা তাঁর কলাবিদ্যার সবগুলো শাখাসহ লেখনীতে উঠে আসেনি । বিদগ্ধ মহলে বলা হয়ে থাকে জীবনকে জড়িয়ে নিত্যদিনের সাদামাঠা অনুভব থেকে শুরু করে  আদি থেকে অনাগত কালের গুরু গম্ভীর দর্শন পর্য্যন্ত  বাড়তি কোন কথা ছাড়াই অবলীলায় রবীন্দ্রনাথের উক্তি দিয়ে  ব্যক্ত করা যায়। রবীন্দ্রনাথ  বাংলা ভাষার কবি বলে বাঙালির অগ্রাধিকার মেনেও বলতে হয়  তিনি, বিশ্ব মানের এবং বিশ্বজনের চিরকালীন মুখপত্র।

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম  চুরুলিয়ায় ধনে মানে ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত কাজী পরিবারে। স্থানীয় মসজিদের ইমাম পিতা কাজী ফকির আহমদের কাছে আরবী-ফার্সি অক্ষরজ্ঞান  । শৈশবে পিতৃহীন কবি আর্থিক দৈন্যদশায় গ্রামের মসজিদ-মক্তবের খাদেম হিসেবে  পারিবারের সহায়ক ভুমিকায় অবতীর্ণ  হয়েছেন । মানসিক সাংস্কৃতিক বিকাশের মূলসূত্র  চাচা বজলে করিমের সাহচর্য্যে এবং গ্রাম্য কবিয়াল, ভ্রাম্যমান পথ নাটকের ‘লেঠো’ দলের আসামপ্দ্রায়িক পরিমন্ডলে। ধারনা করা অসঙ্গত নয় যে, এখানেই কিশোর নজরুল সংস্কৃত সাহিত্য, পুরানের রামায়ণ-মহাভারতের পাঠ নেন। নিজের লেঠো দলের জন্যে রচনা করেন- যুধিষ্ঠিরের সং, চাষার  সং, শকুনি বধ, কবি কালিদাস, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশা, রাজপুতের সং ইত্যাদি ।

১৯১০ সালে  লেঠোর দল থেকে এনে কবিকে ভর্তি করানো হয়  বর্ধমানের রাণীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ স্কুলে । সেখান থেকে পরের বছর তিনি চলে যান  মাথরুন উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় পরবর্তীতে নবীনচন্দ্র  ইন্সটিটিউশানে যেখানে প্রধান শিক্ষক ছিলেন কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিক। সেখান থেকে দারিদ্র্য তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় এক রেল গার্ডের বাবুর্চিখানায়। তারপর আব্দুল ওয়াহিদের বেকারীতে। এখানে ১৯১৪ সালে তিনি নজর কাড়েন আসানসোলের দারোগা অনন্য হৃদয়ের মানুষ রফিজউদ্দিনের। তিনি নজরুলকে ভর্তি করে দেন ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপূর হাইস্কুলে। দারোগা বাড়ি থেকে স্কুলের দুরত্ব বেশী হওয়ায় নামাড়পাড়ায় তাঁর এক আত্মীয় বাড়িতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করে দেন। এখানেও নজরুল স্থায়ী না হয়ে পালিয়ে গিয়ে আবার ভর্তি হন রাণীগঞ্জ  সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ১৯১৫ সালে।

স্কুলজীবনে তিনি গানের শিক্ষক সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, ফারসি সাহিত্যের শিক্ষক হাফিজ নুরুন্নবী এবং  সাহিত্যের শিক্ষক নগেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি এবং  শিক্ষক, যুগান্তর বিপ্লবী দলের কর্মী নিবারন চন্দ্র ঘটক এবং পরবর্তী জীবনের সাহিত্যিক সুহৃদ শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে আসেন। এই মনীষিগনের সাহচর্য্যে দারিদ্র্যপীড়িত, দুরন্ত কবিমনে সাহিত্য-সঙ্গীতের সাথে সাথে ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে চরম বিদ্রোহের বীজ উপ্ত হয় যা পরবর্তীতে জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ ভেদের তাবৎ অন্যায়, অসত্য,অসুন্দরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ স্বরূপ উচ্চকিত তাঁর লেখনীতে এবং ব্যক্তি জীবনেও। এখানে পাঠরত অবস্থায় ম্যট্রিক পরীক্ষার প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে ১৯১৭ সালে তিনি যোগ দেন ইংরেজ সেনা বাহিনীর ৪৯ বাঙালি পল্টনে। করাচীর ক্যন্টনমেন্টে অবস্থান কালে তিনি সেসময় কোলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রায় সব সাহত্য পত্রিকা আনিয়ে নিতেন এভাবে  রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র,এবং রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি মৌলানার সহায়তায় কবি হাফিজ, রুমি,ওমর খইয়্যামের পারসী সাহিত্যের রসাস্বাদনের সুযোগ পান এবং তাতে অনুপ্রাণিত হন। এখান থেকেই তার পরিণত সাহিত্যিক জীবনের অভ্যুদয়। যুদ্ধশেষে ১৯২০ সালে বাঙালি পল্টন ভেঙ্গে দিলে কবি কোলকাতায় ফেরেন। এখানে তিনি সাহচর্য্য এবং আনুক’ল্য পান কমরেড মোজাফফর আহমদের। শান্তিপূরের কবি মোজাম্মেল হক,সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দিন, ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লা,কাজী আব্দুল ওয়াদুদ,অতুল প্রসাদ সেন, মোহিতলাল মজুমদার, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নাট্যচার্য্য শিশিরকুমার ভাদুড়ি প্রমুখের সাথে তাঁর সখ্যতা গড়ে উঠে। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পরিষদ, গজেন্দ্র আড্ডা, ভারতীয় আড্ডা  ইত্যাদি সৃষ্ঠিশীল পরিবেশে গড়ে উঠতে থাকে কবি মানস। এ সময়ের সবচে’ উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে অক্টোবার ১৯২১ যখন ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর সাথে তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে দেখা করেন। বিশ্বব্যাপী উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে,  ১৯২২ সালে বিজলি পত্রিকায় প্রকাশিত বিদ্রোহী কবিতা পরাধীন ভারতের যুব মানসে যে আলোড়ন তুলে  শতাব্দী পরে আজও তার অনুরণন বর্তমান। এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায় জীবনের শেষ বেলায় কবির বাংলাদেশে আসা, জাতিয় কবি হিসেবে বৃত হওয়ার ঘটনা এবং প্রেক্ষাপট। এক অখ্যাত কিশোর নজরুলকে কুমিল্লায় এনেছিলেন দারোগা রফিজউদ্দিন মানবিকতায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে।   বৃটিশ সাম্রাজ্য কাপানো বিদ্রোহী কবি  আর্থিক অভাব অনটন, পারিবারিক নানা বিপর্য্যয় এবং রোগাক্রান্ত হয়ে ১৯৪১ সাল থেকেই লোকচক্ষুর অন্তরালে। ব্রক্ষ্ম সমাজে বিয়ে করে গোঁড়া হিন্দু-মুসলিম দুক’লেরই বিরাগভাজন হয়েছেন আগে।  বিদ্রোহী, কামাল পাশা ইত্যাদি কবিতা লিখে প্রকাশ্যে পাকিস্তান আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলনের বিরোধীতা করে আগে থেকেই স্থানীয় সমাজের বিরাগ ভাজন ছিলেন কবি।  স্বভাবত:ই মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষের পটভুমিতে ভারত-পাকিস্তানের আজাদীর ডামাঢোলে তিনি বিস্মৃত প্রায়।। যেই বিদ্রোহী কবিতার জন্যে নজরুলের যশÑখ্যাতি  আত্মীয় স্বজনেরা  অসুস্থ কবির রোগমুক্তি কামনায় রীতিমত তওবা পড়াচ্ছেন কবিকে আল্লাহ যেন বিদ্রোহী কবিতা লেখার পাপ ক্ষমা করে দেন।  হোমিওপ্যাথী, কবিরাজি চিকিৎসা ব্যর্থ হলে শেকল বেধে রাঁচির পাগলা গারদেও নিয়ে গেছেন তাঁকে। ১৯৫২ সনে শ্যামা প্রসাদমুখার্জির উদ্যোগে  নজরুল চিকিৎসা সহায়ক সমিতি তাকে বিলেতে-ভিয়েনায়  পাঠান,  রোগ তখন নিরাময়ের বাইরে।  ইতিহাসের ছাত্র মাত্রেই জানেন শ্যামাপ্রসাদ, এ কে ফজলুল হক, কাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক যোগাযোগ, ঘনিষ্টতার কথা। তদানীন্তন পুর্ববাংলায় যুক্তফ্রন্টের রাজনীতিতে হক সাহেব আর শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠতার কথাও সবার জানা। পরাধিন ভারতবর্ষে, বিক্ষুদ্ধ তারুন্যের প্রতীক নজরুলকে মনে রেখেছেন বাঙ্গালি  জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নয় মাস পাকিস্তানের কারাগারে বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে ৭২ এর ১০ জানুয়ারী তিনি যখন দেশে ফেরেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সামনে তখন হাজারো সমস্যা। মানবিকতা,শ্রদ্ধাবোধ, ইতিহাসের প্রতি দায়াবদ্ধতা কিসের টানে তিনি সম্পুর্ণ ব্যক্তিগত চিন্তায়, ত্বরিত সিদ্ধান্তে ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ সনে প্রায় ৩১ বছর ধরে জীবন থেকে নির্বাসিত কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন তা আজো গবেষনার বিষয়। হতে পারে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত গানের তেজোদ্দীপ্ত ভুমিকা, হতে পারে বাঙ্গালি জাতিয়তাবাদের চেতনার বিকাশ ও প্রতিষ্ঠায় -”মোরা এক বৃন্তে দুটি ফুল হিন্দু মুসলমান” ইত্যাদি যুগান্তকারী কবিতা ও গানের অবদানের মূল্যায়ন করেছেন কিন্তু সবার উপরে মানবিকতাবোধ,দায়বোধ ।

কবির শ্বশুর বাড়ি কুমিল্লায় । এর বাইরেও যৌবনে একাধিক প্রেম, বৃটিশবিরোধী রাজনৈতিক সংশ্রব, কাজি মোতাহার হোসেন, হাবিবুল্লাহ বাহার, খান বাহাদুর আলী আকবর, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ  বন্ধু-বান্ধবদের আমন্ত্রন কবিকে বাংলাদেশে টেনে এনেছে বারবার। এই সুবাদে তারুন্য, প্রেম-বিরহ-বিদ্রোহকে উপজীব্য করে  ২২ বছরের সৃষ্টিশীল জীবনে কবি লিখে গেছেন অজস্র কবিতা, গান। মানুষে মানুষে জাত-পাত, শ্রেণী বৈষম্যের বিরুদ্ধে নজরুলের বিদ্রোহ সমাজ,রাষ্ট্রের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও ব্যাপ্ত । তিনি যখন উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোলের কথা বলেন তা নিছক কোন ব্যক্তির ব্যথা না হয়ে বরং সর্বকালীন নির্য্যাতীত মানুষের বেদনার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।  সামাজিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে মহাবিদ্রোহী হয়েও একই কন্ঠে চিরায়ত প্রেম-“মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতুর্য্য” নজরুল কাব্য-গীতের মূল সূর। আরবী-ফার্সি শব্দের ব্যাঞ্জনায় বাংলা সঙ্গীতে ইসলামী গজলের সার্থক প্রণেতা নজরুল তাঁর গানে নামাজ-রোজা-হজ্ব-যাকাত, খোদা ভক্তিতে যতটা নিবেদিত ততটাই উচ্ছসিত ভজন,কীর্তন, কালি ভক্তি, শ্যামা সঙ্গীতেও। সামাজিক, সাংসারিক মানুষের চোখে এই আপাত:বিরোধীতা নজরুলের  ব্যক্তিগত জীবনাচারেও দৃশ্যমান। । নজরুল গানে বলছেন “সংসারে মোর মন ছিলনা তবু  মানের দায়ে আমি ঘর করেছি সংসারেরি শিকল বাধা পায়ে। শিকলি কাটা পাাখী কি আর পিঞ্জিরাতে ফিরে? সই বলিস ননদীরে, আমি কুল ছেড়ে চলিলাম ভেসে শ্রী কৃষ্ণ নামের তরণীতে প্রেম যমুনার নীরে” ।

তুর্কি,আরবী,ফার্সি প্রভৃতি বিদেশী সূরে যেমন তেমনি সাওতাল,সাপুড়ে,ঝাপ নৃত্যের মত উপজাতিয় ছন্দেও নজরুল রচনা করেছেন অজস্র গান । দু:খের বিষয় বিদেশী গানগুলোর মধ্যে কোন কোন নজরুল গীতির কথা পাওয়া গেলেও  দেশীয় উপজাতীয় গানগুলোর মূল কথা আর সংগৃহীত হয়নি। হলে হয়তো নুতন কোন উপজাতীয় লালন,গগনকে পেয়ে যেত বাংলা সাহিত্য।  ওয়াল্ট হুইটম্যান, রবার্ট ফ্রস্ট, রুমির কবিতার ছায়া পড়ে নজরুলের কবিতায়। নজরুলের বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি আর ফ্রস্টের ‘ট্রি এট মাই উইন্ডো’ পাশাপাশি মিলিয়ে পড়লে ‘ গ্রেট মেন থিংকস এলাইক’ কথাটার সারবত্তা মিলে।

দেশীয় রাজনীতির ঘোর-প্যাঁচ, ধর্মীয় সাম্প্রাদায়িকতা, সামাজিক ভেদাভেদকে তুলো ধুনো করার পাশাপাশি নজরুলের কবিতায় আন্তর্জাতিকতাবাদের ছায়া আসে তাও জীর্ন,পুরাতন,অচলায়তনের বিরুদ্ধে এবং অতি অবশ্যই সমকালীন উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠে  কামাল পাশার জন্যে “কামাল তু নে কামাল কিয়া ভাই” কিংবা সা’দ জগলুলের উদ্দেশ্যে-  “মিশরে খেদিব ছিল কি ছিলনা ভুলেছিল সব লোক তোমারে পাইয়া ভুলেছিল তারা সুদান হারার শোক” ইত্যাদি কবিতায়। মিশরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক্রিড়নক বাদশা ফারুক, খেদিব ইসমাইল প্রমুখ এবং তুরস্কে পতনন্মুখ ইসলামী খিলাফতের প্রতিনিধি সুলতান আব্দুল হাামিদের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে শিক্ষিত গোঁড়া কিংবা অশিক্ষিত সংখ্যাগরিষ্ঠ আবেগী মুসলিম সমাজের তোয়াক্কা করেননি নজরুল। ধর্ম বিশ্বাসকে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা থেকে তুলে এনে মানবিকতার উদার জমিনে প্রোথিত করে দেশ-বিদেশের সীমানা ছাড়িয়ে এভাবেই  নজরুলের কবিতা বিদ্রোহের  চিরায়ত প্রতীক হয় দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-নজরুল সাহিত্য চর্চায়  প্রবল রাজনৈতিক দ্বিমুখীনতার প্রেক্ষাপট নিয়ে বলার আগে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করতে হয় “ ভুল হয়ে গেছে বিলকুল সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে ভাগ হয়নিকো নজরুল। সেই ভুলটুকু বেঁচে থাক, বাঙালি বলতে একজন আছে দু:খ তার ঘুচে যাক” পাকিস্তান আর ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে বিভক্ত উপমহাদেশে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া  বাঙালির জন্যে কাতর অন্নদা শংকর রায়ের এই আক্ষেপ।  তারপর যে কথা না বললেই নয়- যে রবীন্দ্রনাথ নজরুল বঙ্গভঙ্গের প্রকাশ্যে বিরোধীতা করেছেন,আজকের বাংলাদেশ ভূখন্ডে রাজনৈতিক নানা  ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তাঁদের প্রতিষ্ঠা। দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে ভারত বিরোধীতা এবং  জনস্বার্থে যে কোন দাবীকে ভারতের উসকানী হিসেবেই চিহ্নিত করেছে শাসক শ্রেণী।  অদৃষ্ঠের পরিহাসই বলতে হয় পাকিস্তান আন্দোলনকে ফাঁকিস্তান বলার অপরাধে যে নজরুল কোলকাতা এবং পরবর্তীতে ঢাকাতেও আক্রান্ত হয়েছিলেন সেই নজরুলকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে পাকিস্তানী শাসকচক্র এবং তাদের উচ্ছিষ্টভোগীর দল। যে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ কাব্যকীর্তি, নন্দনতত্বকে কলাকৈবল্যবাদ বলে প্রকাশ্যে ঘৃণা করে তারাই আবার নজরুলকে ধর্মীয় মোড়াকে পীর ফকির সাজিয়ে উপস্থাপিত করেন।  কাজী নজরুল ইসলাম পুরা নাম এভাবে না লিখলে যে শিক্ষক ছাত্রকে পেটান সেই তিনিই কিন্তু কৃষ্ণ মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ কিংবা কাজি অনিরুদ্ধের নাম মুখে আনতে চাননা, নজরুলপতœী প্রমিলাকে দায়ী করেন নানাভাবে। এভাবে  হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোনজন’র  কবিকে শুধুমাত্র মুসলমানের কবি হিসেবে প্রচারিত করে তাঁকে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে। হিন্দু রবীন্দ্রনাথকে বিসর্জন আর নজরুলকে খাঁটি মুসলমান বানানোর এই প্রক্রিয়ায় প্রতিক্রিয়াশীল চক্র নজরুলের কবিতা সংশোধনের ধৃষ্ঠতা দেখাতেও কসুর করেনা। এভাবে প্রকারান্তরে বাঙ্গালিকে শিল্প-সাহিত্যে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার থেকে নির্মূল করার পাকিস্তানী প্রচেষ্ঠার বিপরীতে নানা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র-নজরুলের জীবনবোধ,প্রেরণাশ্রয়ী গান কবিতাকে আশ্রয় করে গড়ে উঠে বাঙালির আত্মঅন্বেষা, যার সফল পরিণতি মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্টা। তাই বলে খন্ডিত নজরুলকে আশ্রয় করে রবীন্দ্রনাথকে দুরে ঠেলে দেয়ার চেষ্টাও উবে যায়নি। ব্যক্তি জীবনের মত সামাজিক,রাষ্টীয জীবনেও রয়ে গেছে কুসংস্কার,জড়তা,অসাম্য, অসুন্দরের প্রতি পিছুটান। রবীন্দ্র-নজরুল জন্ম জযন্তীর উৎসবে আত্মহারা বাংলাদেশেআজও মানবতা লাঞ্ছিত  হয়, দুর্বল মার খায়, বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে। সম্পুর্ণ বাঙালিয়ানায় ব্যক্তি-সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের এই কালিমা দূর করার মধ্য দিয়েই হতে পারে সত্যিকার মাহাত্ম্যপূর্ণ রবীন্দ্র নজরুল জন্ম জয়ন্তী।

* প্রবন্ধটি রবীন্দ্র-নজরুল জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে সমন্বিত আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র কুয়েত আয়োজিত আলোচনা সভায় পঠিত।

About

আরও পড়ুন...

নজরুল ইসলাম তোফা

প্রকৃত বন্ধু চিনে যুক্তিযুক্ত সম্পর্ক দোষের নয়

নজরুল ইসলাম তোফা:: মানুষে মানুষে খুব পাস্পরিক সুসম্পর্কের মাধ্যমে তৈরি হয় বন্ধুত্ব। বিনা কারণে যেমন …

error: বাংলার বার্তা থেকে আপনাকে এই পৃষ্ঠাটির অনুলিপি করার অনুমতি দেওয়া হয়নি, ধন্যবাদ