কুয়েত হয়ে উঠছে পরিযায়ী পাখির নতুন আশ্রয়স্থল। মরুভূমির দেশ কুয়েত। যেখানে গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ছুঁয়ে যায় ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর শীতকালে কখনো কখনো তা নেমে আসে শূন্যের কাছাকাছি। এমন চরম ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে খোলা আকাশে সচরাচর পাখির কোলাহল শোনা যায় না। সাধারণত কয়েকটি কবুতর, ঘুঘু ও চড়ুই পাখিই যেন এই দেশের স্থায়ী বাসিন্দা। তবু প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে নতুন গল্প লিখছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুয়েতের আকাশে ভেসে আসছে শীতের অতিথিরা দূর ইউরোপ ও মধ্য এশিয়া থেকে উড়ে আসা পরিযায়ী পাখির দল। আগে কুয়েতের আবহাওয়ার একটি নির্দিষ্ট ছক ছিল গ্রীষ্ম মানেই তীব্র দাবদাহ, শীত মানেই হালকা ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাস। বদলে যাওয়া ঋতুচক্রে এখন সেই নিয়ম ভেঙে পড়েছে। কখনো হঠাৎ বৃষ্টি, কখনো ধূলিঝড়, কখনো অপ্রত্যাশিত শীত কিংবা গরম সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নতুন ছকে চলতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কুয়েতের কিছু অঞ্চল ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে অতিথি পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থলে। দেশটির পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে Kuwait Environmental Protection Society (KEPS)-এর পাখি পর্যবেক্ষণ ও সুরক্ষা দল। দীর্ঘদিন ধরে তারা মাঠপর্যায়ে গবেষণা চালিয়ে কুয়েতের পাখি ও বন্যপ্রাণীর তালিকা প্রস্তুত করছে। KEPS-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৫ সালে কুয়েতে মোট ৪২৪ প্রজাতির পাখি নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি প্রজাতি নতুন করে প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয়েছে, যা কুয়েতের জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। শীত মৌসুমে কুয়েতের কয়েকটি এলাকা যেন অস্থায়ী পাখির রাজ্যে পরিণত হয়। সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে ২৪ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি নিয়মিতভাবে কুয়েতে অবস্থান করতে দেখা গেছে। এই তালিকায় রয়েছে ইউরোপীয় রবিন, সং থ্রাশ, বার্ন আউল, গ্রেটার হোয়াইট-ফ্রন্টেড গুজ এবং বিরল প্রজাতির এভারসম্যানের রেডস্টার্ট। বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে পাঁচ বছর পর গ্রেটার হোয়াইট-ফ্রন্টেড গুজের পুনরাগমন। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রজাতির অনুপস্থিতি গবেষকদের উদ্বিগ্ন করলেও এবারের প্রত্যাবর্তন নতুন আশার আলো জাগিয়েছে। পাঁচ বছরের নীরবতার পর আবারও কুয়েতের আকাশে দেখা মিলেছে এভারসম্যানের রেডস্টার্টের। গত বছরের শেষ দিকে আল-আবরক, আল-মুতলা ও আল-জুলাইয়া এলাকায় চারবার এই বিরল পাখিটির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়। KEPS-এর গবেষকরা বলছেন, এভারসম্যানের রেডস্টার্ট কুয়েতে একটি অত্যন্ত বিরল প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত। এর ফিরে আসা কেবল একটি পাখির আগমন নয়, বরং কুয়েতের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। ২০২৫ সালের বার্ষিক পাখি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রস্তুতের অংশ হিসেবে মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত সব তথ্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত গবেষণা প্ল্যাটফর্ম eBird-এ সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে কুয়েতের মরুভূমি আজ বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য গবেষণার মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কুয়েতের কিছু অঞ্চল শীতকালে পরিযায়ী পাখির জন্য তুলনামূলক নিরাপদ হয়ে উঠছে। এই প্রাকৃতিক আশ্রয় টিকিয়ে রাখতে পেরেছে দেশটির কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ, পাখি শিকার বন্ধে নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে। মরুভূমির বুকে এই পাখিদের উপস্থিতি যেন প্রকৃতির এক নীরব বার্তা, মানুষ যত্ন নিলে, প্রকৃতি তার সৌন্দর্য ফিরিয়ে দেয় বহুগুণে। গবেষকদের মতে, কুয়েতের মরুভূমিতে শীতকালীন অতিথি পাখির উপস্থিতি শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা ও সংরক্ষণ উদ্যোগ নিলে কঠিন পরিবেশেও জীববৈচিত্র্য টিকে থাকতে পারে। শীতের সকালে কুয়েতের আকাশে যখন কোনো অচেনা পাখি নজরে পরবে তখন মনে হবে মরুভূমিও একদিন হয়ে উঠতে পারে প্রাণের আশ্রয়স্থল।
লেখক: মঈন উদ্দিন সরকার সুমন
সভাপতি: বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েত









Discussion about this post