মঈন উদ্দিন সরকার সুমনঃ আরব উপসাগরের নীল জলরাশির পাড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কুয়েত টাওয়ার বহুদিন ধরেই আমার কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। দূর থেকে বহুবার দেখেছি, ছবি তুলেছি, কিন্তু ভেতরে ঢুকে এর প্রকৌশল সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুভব করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। অবশেষে এক বিকেলে তিন দিনারের টিকিট কেটে এই টাওয়ারে ওঠার সৌভাগ্য হয় আমার। সেই অভিজ্ঞতা আমার ভ্রমণে যুগ করে প্রযুক্তিগত সাফল্য, জাতীয় ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত অনুভূতির এক অনন্য মিলন। কুয়েত টাওয়ার যেমন একটি স্থাপত্য নিদর্শন তেমনই এটি কুয়েত রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়, আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি।

টিকিট কাউন্টার থেকে আকাশছোঁয়া যাত্রা: বিকেলের নরম রোদে টাওয়ারের পাদদেশে পৌঁছাতেই মনে হলো আমি যেনো দাঁড়িয়ে আছি কুয়েতের ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মৃতিচিহ্নের সামনে। তিন দিনারের টিকিট হাতে নিয়ে লিফটে ওঠার মুহূর্তে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লিফট আমাকে নিয়ে গেল বহু উঁচুতে যেখানে শহর আর সমুদ্র একসঙ্গে মিশে যায় দৃষ্টির সীমানায়। উপরে পৌঁছে চারদিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, যেন কুয়েত সিটি একটি মানচিত্র হয়ে পায়ের নিচে বিছিয়ে আছে। একদিকে ঝকঝকে আধুনিক অট্টালিকা, অন্যদিকে আরব উপসাগরের শান্ত জলরাশি। সূর্যের আলো পানিতে পড়ে রুপালি আভা তৈরি করছিল। তখনই উপলব্ধি করলাম, কুয়েত টাওয়ার কেবল দেখার জন্য নয় এটি অনুভব করার এক স্থাপনা। তথ্যমতে ১৯৭৯ সালে উদ্বোধনের পর থেকে কুয়েত টাওয়ার দেশটির সবচেয়ে স্বীকৃত ল্যান্ডমার্কে পরিণত হয়েছে এবং সমসাময়িক আরব স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। এই টাওয়ার নির্মাণের ধারণাটি প্রথম উত্থাপিত হয় ১৯৬৩ সালে, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ও পরবর্তীতে কুয়েতের আমির প্রয়াত শেখ জাবের আল আহমদ আল জাবের আল সাবাহের হাত ধরে। মূল লক্ষ্য ছিল কুয়েতের দ্রুত সম্প্রসারিত নগর অবকাঠামোকে টেকসইভাবে সমর্থন করার জন্য একটি বৃহৎ জলাধার প্রকল্প গড়ে তোলা। তবে পরিকল্পনার প্রাথমিক পর্যায়েই এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত স্থাপনা না থেকে একটি নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীকে রূপ নেয়। শুরুতে কুয়েতের পানির সংকট ও নগর ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই ছিল প্রকল্পটির প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাওয়ারগুলো হয়ে ওঠে আধুনিক কুয়েতের আত্মবিশ্বাসী অগ্রযাত্রার প্রতীক যেখানে বিজ্ঞান, শিল্প ও সংস্কৃতি এক সুতোয় গাঁথা।

কুয়েত সিটির উপকূলে অবস্থিত এই কমপ্লেক্সে রয়েছে তিনটি পৃথক টাওয়ার, যাদের উচ্চতা ও কার্যকারিতা ভিন্ন হলেও সম্মিলিতভাবে তারা একটি সমন্বিত স্থাপত্য রূপ তৈরি করেছে। প্রথম ও প্রধান টাওয়ারটির উচ্চতা ১৮৭ মিটার এবং ভিত্তির ব্যাস প্রায় ২০ মিটার। এটি এক মিলিয়ন ঘন গ্যালন পানির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি বিশাল জলাধার হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয় টাওয়ারটি ১৪৭ মিটার উঁচু, যার ভিত্তি ব্যাস ১৮ মিটার; এটি প্রধান টাওয়ারের সঙ্গে পানির ভার ভাগ করে নেয় এবং কাঠামোগত ভারসাম্য রক্ষা করে। তৃতীয় ও সবচেয়ে ছোট টাওয়ারটির উচ্চতা ১১৩ মিটার এবং ভিত্তি ব্যাস ১২ মিটার। এটি মূলত বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বহিরাগত আলোকসজ্জার দায়িত্ব পালন করে। এর কাঠামোতে স্থাপিত প্রায় ১০০টি শক্তিশালী ফ্লাডলাইট রাতের অন্ধকারে পুরো কমপ্লেক্সকে আলোকিত করে, যা উপসাগরের জলরাশিতে প্রতিফলিত হয়ে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করে। কুয়েত টাওয়ারের স্থাপত্য নকশা শুধু প্রযুক্তিগত কৃতিত্ব নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী কুয়েতি সংস্কৃতির প্রতীকী রূপ। প্রধান টাওয়ারটি ধূপ জ্বালানোর পাত্র ‘মাবখারা’ র আদলে নির্মিত, যা আরব আতিথেয়তার প্রতীক। মাঝের টাওয়ারটি ‘মারাশ’ বা সুগন্ধি ছিটানোর যন্ত্রের রূপকে ধারণ করে, আর ছোট টাওয়ারটি ‘মেখলা’ বা কোহল রাখার পাত্রের প্রতিফলন। এই প্রতীকী নকশার মাধ্যমে স্থপতিরা আধুনিক প্রকৌশলকে কুয়েতের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে টাওয়ারগুলো শুধু কংক্রিট ও ইস্পাতের কাঠামো নয়, বরং ইতিহাস ও পরিচয়ের বাহক হয়ে উঠেছে। এর স্থাপত্যিক গুরুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ, ১৯৮০ সালে কুয়েত টাওয়ার লাভ করে ইসলামিক স্থাপত্যের মর্যাদাপূর্ণ Aga Khan Award for Architecture। এই পুরস্কার প্রমাণ করে যে কুয়েত টাওয়ার কেবল জাতীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৈশ্বিক স্থাপত্য মানচিত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করেছে। ১৯৯০ সালে ইরাকি আগ্রাসনের সময় টাওয়ারগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গোলাবর্ষণ ও অগ্নিকাণ্ডে এর কাঠামোর একাংশ ভেঙে পড়ে এবং অভ্যন্তরীণ সুবিধাসমূহ ধ্বংস হয়। যুদ্ধ পরবর্তী পুনর্গঠন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ব্যাপক সংস্কার কাজ হাতে নেওয়া হয় এবং অবশেষে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে টাওয়ারগুলো পুনরায় জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এটি কুয়েত জাতির পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে আরব স্থাপত্য ও নগর ঐতিহ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা কুয়েত টাওয়ারকে আধুনিক স্থাপত্য বিভাগে আরব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এই স্বীকৃতি টাওয়ারগুলোর আঞ্চলিক গুরুত্ব ও সাংস্কৃতিক মূল্যকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে কুয়েতের জাতীয় দিবস উপলক্ষে টাওয়ারগুলো লাল, সাদা, সবুজ ও কালো জাতীয় পতাকার রঙে আলোকিত হয়। উপসাগরের তীরজুড়ে সেই আলোর প্রতিফলন কেবল উৎসবের সৌন্দর্য নয়, বরং জাতীয় ঐক্য ও গর্বের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে ওঠে। কুয়েত টাওয়ার এখন জলাধার প্রকল্পই নয়, এটি কুয়েত রাষ্ট্রের ইতিহাস, সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও আধুনিকতার এক জীবন্ত দলিল।

কথা হয় টাওয়ারে ভ্রমন করতে আসা অনেক পর্যটকের সাথে তাদের অনেকে কুয়েতে যুগের পর যুগ বসবাস করছেন কিন্তু টাওয়ারে উঠার সুযোগ হয়ে উঠেনি। তাদের আবেগময় অনুভুতির কথাও ভিডিও ধারন করি। এই টাওয়ারে ভ্রমন করলে মনে হবে এটি কেবল একটি দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন নয়, বরং প্রযুক্তিগত সাফল্য ও জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ। নিচে নামার সময় মনে হচ্ছিল, আমি শুধু ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছি না আমি নিয়ে যাচ্ছি কুয়েতের ইতিহাসের একটি অংশ, একটি অনুভূতি। ইতিহাস ও মানুষের গল্পকে হৃদয়ে ধারণ করার নামই হয়তো ভ্রমণ।


লেখক: মঈন উদ্দিন সরকার সুমন
সভাপতি বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েত









Discussion about this post