
কুয়েতে ত্রিশ রোজা পূর্ণ হলো বৃহস্পতিবার। শুক্রবার পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপনের প্রস্তুতি নিলেন মুসলমানরা। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থির পরিস্থিতির কারণে এবারের ঈদ এসেছে এক ভিন্ন বাস্তবতায় নিঃশব্দ, সীমিত, এবং আতঙ্কঘেরা। নিরাপত্তা বিবেচনায় কুয়েত সরকার গ্রহণ করেছে কঠোর পদক্ষেপ। খোলা স্থানে ঈদের নামাজ আদায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি দেশের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ গ্র্যান্ড মসজিদ-এও অনুষ্ঠিত হয়নি ঈদের জামাত। একইসঙ্গে ঈদকে ঘিরে সব ধরনের অনুষ্ঠান, জনসমাগম এবং উৎসব কার্যক্রমও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে প্রবাসীসহ সকল মুসল্লিদের ঈদ উদযাপন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে ছোট পরিসরে। প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশ দূতাবাসে বড় পরিসরের কোনো আয়োজন হয়নি। ঈদের নামাজ শেষে বাংলাদেশ হাউজে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে প্রবাসীদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের ঐতিহ্যও এবার থেমে গেছে পরিস্থিতির কারণে। এরই মাঝে ত্রিশ রোজার শেষ বিকেলটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ভিন্ন এক উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েত-এর কয়েকজন সদস্য। অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে, আব্বাসিয়া এলাকার একটি খোলা মাঠে বসে আয়োজন করা হয় ইফতারের। কেউ নিয়ে এলেন ফল, কেউ জিলাপি, কেউ লাবান ও খেজুর, আবার কেউ হোটেল থেকে নিয়ে এলেন হায়দারাবাদি বিরিয়ানি। সব মিলিয়ে প্রায় দশজনের একটি ছোট্ট দল খোলা আকাশের নিচে ইফতারে মিলিত হলো। তবে প্রকৃতি যেন সেই আয়োজনকে আরও নাটকীয় করে তুলল। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, ঘন ঘন বজ্রপাত আর বজ্রধ্বনির মধ্যেই সম্পন্ন হলো ইফতার। পাশের মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করা হয়, আর দলনেতা হিসেবে ইমামতির দায়িত্বও নিতে হয়েছে বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব কুয়েত এর সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক মঈন উদ্দিন সরকার সুমন। নামাজ শেষে শুরু হয় বৃষ্টি। হালকা ফোঁটা ভেবে অপেক্ষা করলেও মুহূর্তেই তা রূপ নেয় মুষলধারে বর্ষণে। আশ্রয় নিতে হয় কাছের একটি ছোট্ট রেস্টুরেন্টে। সেখানে চায়ের আড্ডায় কিছুটা সময় কাটানোর পরও বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ ছিল না। এদিকে সহকর্মীদের কেউ কেউ যমুনা টিভি প্রতিনিধি হেবজু মিয়া, একাত্তর টিভি প্রতিনিধি সাদেক রিপন, চ্যানেল আই এর প্রতিনিধি জিসান মাহমুদ আগেই সরে গেলেন, কয়েকজন রয়ে গেলেন সময় টিভি প্রতিনিধি মঈন সুমন, বাংলা টিভি র প্রতিনিধি আ হ জুবেদ, নিউজ টুয়েন্টি ফোর টিভির প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর খান পলাশ, দেশ টিভি প্রতিনিধি সেলিম হাওলাদার সহ অন্যরা বৃষ্টিবন্দি পরিস্থিতিতে। অবশেষে প্রায় দুই ঘণ্টা পর স্কাই ট্যাচ ট্রাভেল এজেন্সির এমডি হোসনে মোবারকের সহায়তায় মুক্তি মেলে সেই দুর্ভোগ থেকে। রাত গড়িয়ে তখন প্রায় ১২টা। বাসায় ফিরে ঈদের প্রস্তুতি নিতে নিতে রাত হয়ে যায় আরও গভীর। কিন্তু প্রকৃত নাটক শুরু হয় এরপরই। ফজরের নামাজের সময় হঠাৎ বেজে ওঠে সাইরেন। একের পর এক সতর্ক সংকেত জানিয়ে দেয় পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। খবর আসে, ইরানের পক্ষ থেকে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালানো হচ্ছে। ঈদের দিন ফজর, ঈদের নামাজ এবং জুমার নামাজ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সময়ই সাইরেন আর বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। নামাজ আদায় করতে হয় এক অদ্ভুত আতঙ্কের মধ্যে। শুক্রবার রাত ১০টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত একাধিকবার সাইরেন বেজে ওঠে, যা পুরো দেশে উদ্বেগ ছড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে শনিবার ভোরে। সকাল প্রায় ৫টার দিকে আবারও সাইরেন বাজে। কুয়েতের আকাশে তখন দৃশ্যমান হয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তৎপরতা। একাধিক মিসাইল আকাশেই ধ্বংস করা হয়। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারদিক, আকাশজুড়ে দেখা যায় আগুনের রেখা আর ধোঁয়ার ছাপ। এ দৃশ্য সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তোলে। সবকিছুর মাঝেও একটাই স্বস্তি কুয়েতের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চলেছে। তবুও এবারের ঈদ রয়ে গেল এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার নাম খোলা আকাশের নিচে ইফতার, আর সাইরেনের আতঙ্কে কাটানো ঈদ।
এক সময়ে কুয়েত ছিল ছোট একটি উপকূলীয় শহর। তখন মসজিদের মাইক্রোফোন, রেডিও বা মোবাইল ফোন ছিল না। তাই সূর্যাস্তের সঠিক সময় সবাইকে জানানোর জন্য এমন একটি পদ্ধতির প্রয়োজন ছিল যা দূর পর্যন্ত শোনা যাবে। কামানের গর্জন সেই কাজটি সহজ করে দেয়। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা মানুষ এই শব্দ শুনেই বুঝতে পারতেন যে ইফতারের সময় হয়ে গেছে। এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ইতিহাস এটি। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, কুয়েতে ইফতার কামানের প্রথা শুরু হয় ১৯০৭ সালে। সে সময় দেশটির শাসক ছিলেন শেখ মুবারক আল সাবাহ। তখন আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা বা সবার কাছে ঘড়ি না থাকায় সূর্যাস্তের সময় মানুষকে জানাতে এই কামান ব্যবহার করা হতো। দেশটির ইতিহাসে উল্লেখ আছে, প্রথম ইফতার কামানটি নিক্ষেপ করেছিলেন আলি বিন আকাব আল-খাজরাজি নামের একজন ব্যক্তি। প্রথম দিকে কামানটি কুয়েত সিটির সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত সেইফ প্যালাস সংলগ্ন স্থান থেকে ছোড়া হতো। পরে শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত নাইফ প্যালাস এলাকায় এটি স্থানান্তর করা হয়। রমজানের বিশেষ আকর্ষণ ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এখন এই নাইফ প্যালাস। বর্তমানে ইফতারের সময় জানার জন্য নানা আধুনিক মাধ্যম থাকলেও এই ঐতিহ্য এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছে কুয়েত। রমজান মাসে প্রতিদিন সূর্যাস্তের আগে সেনা সদস্যরা কামান প্রস্তুত করেন। এরপর আজানের মুহূর্তে এক রাউন্ড কামান নিক্ষেপ করা হয়। এই দৃশ্য দেখতে রমজান মাসে প্রতিদিন ইফতারের কিছু সময় আগে থেকেই নাইফ প্যালাসের আশপাশে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। দেশটির অনেক নাগরিকের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক প্রবাসীও এই ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য দেখতে সেখানে উপস্থিত হন। কুয়েতের এই কামান এখন আর কেবল ইফতারের সময় জানানোর মাধ্যম নয়, এটি দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং রমজানের আবেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কামানের গর্জন শোনার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে উপস্থিত মানুষের মাঝে এক ধরনের আনন্দঘন আবহ তৈরি হয়, যা রমজানের বিশেষ অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে। সূর্যাস্তের মুহূর্তে কামানের গর্জন যেন রোজাদারদের কাছে এক আনন্দের ঘোষণা রোজা ভাঙার সময় এসে গেছে। রমজানের প্রতিদিনের এই ছোট্ট আচার কুয়েতের ইতিহাস, ধর্মীয় চেতনা এবং সামাজিক ঐক্যের একটি জীবন্ত নিদর্শন হয়ে আজও টিকে আছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে অনেকেই সেখানে ছবি তোলেন এবং ভিডিও ধারণ করেন। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। অনেক পরিবার রমজানের সময় সন্তানদের নিয়ে সেখানে যান, যাতে তারা দেশের এই পুরোনো ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে। কুয়েতে বসবাসকারী বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের কাছেও নাইফ প্যালাসের ইফতার কামান একটি বিশেষ আকর্ষণ। অনেকেই রমজানের কোনো একদিন সেখানে গিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেন। অনেকের মতো আমিও একাধিকবার এই ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছি। নাইফ প্যালাসে গিয়ে ইফতারের মুহূর্তে কামানের গর্জন দেখেছি এবং সেই দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সংবাদও করেছি।
রমজানের সেই মুহূর্তে মানুষের অপেক্ষা, কামানের প্রস্তুতি এবং সূর্যাস্তের সাথে সাথে গর্জে ওঠা কামানের দৃশ্য সব মিলিয়ে এটি কুয়েতের একটি অনন্য ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। এক সময় মানুষের কাছে সূর্যাস্তের সময় জানানোর জন্য এই কামান ব্যবহার করা হতো। আজ প্রযুক্তির যুগে তার প্রয়োজন না থাকলেও কুয়েত সরকার এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে রেখেছে। ফলে প্রতি বছর রমজান এলে নাইফ প্যালাসে কামানের গর্জন যেন আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আবেগের এক সুন্দর মিলনস্থল এই ঐতিহ্য।
লেখকঃ মঈন উদ্দিন সরকার সুমন
সভাপতিঃ বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েত














Discussion about this post