কুয়েতে রমজান শুধু একটি ধর্মীয় মাস নয়, এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক জীবনের এক বিশেষ সময়। প্রবাসীদের জন্য এটি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং মনে হলেও, রোজা, আতিথ্য, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং রমজানের বিশেষ খাবারের মাধ্যমে এই মাসকে উপভোগ করা যায়। আমার কুয়েত জীবনের অভিজ্ঞতায়, রমজান শুধু ধর্মীয় আচারই নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত উৎসব, যা কমিউনিটি এবং পরিবারকে একত্রিত করে। প্রথমবার রমজান এখানে দেখার সময় আমি একটু দ্বিধান্বিত ছিলাম। দিনে খাওয়া, পানীয় ও ধূমপান জনসাধারণের মধ্যে নিষিদ্ধ এবং তা ভঙ্গ করলে জরিমানা বা কারাদণ্ডের শাস্তি থাকে। ক্যাফে ও রেস্টুরেন্টগুলো সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। দোকানপাটের খোলার সময় অসংলগ্ন মনে হয়। রাতে ট্রাফিক একেবারে ভয়াবহ, এবং জীবন যেন পুরোপুরি উল্টো হয়ে যায়। তবে স্থানীয় মুসলিমরা এই মাসকে বরাবরের মতো আনন্দের সময় বলে মনে করেন। পরিবারে একত্রিত হওয়া, রাতের সামাজিক অনুষ্ঠান, সম্প্রদায়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, দান-খয়রাত এবং আত্মার পুনর্জীবনের এক অনন্য অনুভূতি এই মাসে অনুভূত হয়। প্রবাসী বাংলােদেশীদের কথা না বললেই নয় । কুয়েতে কয়েক শতাধিক প্রবাসী সংগঠন আছে, যারা সাধারণ সময়ে বেশিরভাগই নিষ্ক্রিয় থাকে। কিন্তু রমজান মাসে এই সংগঠনগুলো এক নতুন প্রাণ পায়। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যক এবং আঞ্চলিকসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা মরুভূমির এই দেশে একত্রিত হয়ে পারস্পরিক বন্ধন মজবুত করে। ইফতার পার্টি, দোয়া ও দান কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রবাসীরাও এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে। তাদের পরিচিতি এবং অন্যদের সাথে কুশলবিনিময়ের একটি ক্ষেত্রে তৈরি হয় রমজান মাসে ইফতার পার্টির মধ্যদিয়ে। কুয়েতে রমজানের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে শিশুদের বড় একটি উৎসব হয় যার নাম গিরগিয়ান। এই দিনগুলুতে শিশুরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গায় এবং মিষ্টি ও বাদাম পায়। আগে ছেলেরা মুখে কয়লা লাগাতো এবং পুরানো তেলের টিন দিয়ে ঢাক বাজাতো। মেয়েরা পরতো বুশনেগ, একটি ঐতিহ্যবাহী হেডকভারিং। আজকাল শিশুরা রঙিন, সুন্দর পোশাক এবং চমকপ্রদ ব্যাগ পরিধান করে। দিনভর রোজা শেষে রাতের আনন্দ উপভোগ করার জন্য কুয়েতের প্রসিদ্ধ স্থান মুবারাকিয়ার পুরনো সৌক সবচেয়ে অনুকূলে থাকে। রমজানে এই আউটডোর মার্কেটে মানুষের ভিড়, রঙিন আলোকসজ্জা, এবং বিভিন্ন দোকানের হুল্লোড় এক অসাধারণ দৃশ্য সৃষ্টি করে। এখানে খেজুরের বাজার, এই সময়ে সবচেয়ে ব্যস্ত থাকে। খেজুর হলো সেই প্রথম খাবার যা মুসলিমরা রোজা ভাঙার সময় খায়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর এই ঐতিহ্য আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কাছে। খেজুর শরীরের জন্য উপকারী। এতে থাকা প্রাকৃতিক চিনি ও ভিটামিন শরীরকে শক্তি জোগায়, যা রোজা শেষে ক্লান্তি দূর করতে সহায়ক। হরেক রকম হরেক দেশের খেজুরের বিভিন্ন প্রকারের স্বাদ পরীক্ষা করতে দেয় বিক্রেতারা। বিক্রেতাদের বন্ধুসুলভ আচরণ এখানে প্রতিয়মান হয়। রমজানের অন্যতম মূল আকর্ষণ হলো ইবাদত। শুধুমাত্র রোজা রাখা নয়, পবিত্র কোরআন পাঠ করা, মসজিদে অতিরিক্ত নামাজে অংশ নেওয়া এগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্যিকারের রোজা মানে শুধু খাবার, পানীয় ও শারিরীক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা নয়, বরং খারাপ অভ্যাস, নেতিবাচক চিন্তা, অশ্লীল কাজ ও অশালীন কথাবার্তা থেকেও বিরত থাকা। তাইতো রমজান মাসে তারাবি ও কিয়ামের নামাজে জামাতের সঙ্গে অংশ নেওয়া যেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের জন্য একটি মিলনের উৎসব। অনেকের শখ জন্মে মধ্যরাতে নতুন কোনো মসজিদে কিয়ামের নামাজ আদায় করার, এবং বিশিষ্ট আলেমদের কণ্ঠে কোরআন শোনার। সবকিছুর মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভ একনিষ্ঠ ইবাদত ও নিয়মিত যিকিরের মাধ্যমে শান্তিময় নৈকট্য অনুভব করা। কারো কারো শখ জাগে এই রমজান মাসে মধ্যরাতে কিয়ামের নামজ আদায় করতে প্রতিদিন কোন না কোন নতুন মসজিদে যাওয়া। নামাজ আদায়েরে পাশাপাশি বিশিষ্ট আলেমদের কন্ঠে কোরআন শুনাও একটি শখ হয়ে দাড়াঁয়। সব কিছুর মুলেই কিন্তু আল্লাহর সান্নিধ্য বা নৈকট্য লাভ। আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস, একনিষ্ঠ ইবাদত, এবং সর্বদা আল্লাহর স্মরণ করা। যিকির এর মাধ্যমে শান্তিময় নৈকট্য বা সান্নিধ্য পাওয়া যায় সেটা খূঁজে বেড়ায় অনেকে। এবছর ইসরাইল ও মার্কিন-ইরানের সংঘাতের কারণে এই আনন্দ কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ২৮ ফেব্রুয়ারী থেকে সব জনসমাগম নিসিদ্ধ থাকার কারনে সকল ইফতার পার্টি বাতিল করা্ হয়। হঠাৎ তারাবির নামাজ কয়েকদিন স্থিতিশীল থাকার পর আবার অনুমতি পায় সংক্ষিপ্তভাবে। ধীরে ধীরে মুসলমান সমাজ আবার তার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। তবে রমজানের আনন্দ ও উৎসবের মৌসুম পূর্বের মতো নেই।
লেখক: মঈন উদ্দিন সরকার সুমন
সভাপতি: বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েত








Discussion about this post