এক সময় সরকারি কোনো কাজের জন্য কুয়েতে নাগরিক ও প্রবাসীদের এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হতো। রেসিডেন্সি নবায়ন, ট্রাফিক জরিমানা পরিশোধ, শ্রম অনুমতি যাচাই কিংবা সরকারি নোটিশ সংগ্রহ সবকিছুর জন্য আলাদা অফিসে যেতে হতো। কিন্তু প্রযুক্তির কল্যাণে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। কুয়েত সরকার চালু করেছে ‘সাহেল’ (Sahel) নামের একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে নাগরিক ও প্রবাসীরা মোবাইল ফোন থেকেই শতাধিক সরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। ফলে সময় বাঁচছে, কমছে হয়রানি এবং বাড়ছে সেবার স্বচ্ছতা।
কী এই সাহেল?
সাহেল আরবি শব্দ, যার অর্থ সহজ বা সরল। নামের সঙ্গে মিল রেখেই কুয়েত সরকার নাগরিক সেবাকে সহজ ও দ্রুত করার লক্ষ্যে অ্যাপটি চালু করেছে। বর্তমানে কুয়েতের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সেবা এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছে। একজন ব্যবহারকারী ঘরে বসেই নিজের পরিচয়পত্র, আবাসন সংক্রান্ত তথ্য, ট্রাফিক জরিমানা, স্বাস্থ্যসেবা, আদালতের নোটিশ, শ্রম অনুমতি, সরকারি ফি পরিশোধসহ বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। প্রবাসীদের জন্য আশীর্বাদ ‘সাহেল’ । কুয়েতে প্রায় আড়াই থেকে তিন মিলিয়ন প্রবাসী বসবাস করেন। তাদের জন্য সাহেল অ্যাপ বিশেষ সুবিধা নিয়ে এসেছে। প্রবাসীরা এখন রেসিডেন্সি বা ইকামার মেয়াদ যাচাই, স্বাস্থ্যবিমার অবস্থা, কর্ম অনুমতির তথ্য, সরকারি নোটিশ এবং বিভিন্ন ফি পরিশোধের কাজ কয়েক মিনিটেই সম্পন্ন করতে পারেন। এতে দালাল নির্ভরতা কমেছে এবং প্রশাসনিক জটিলতাও অনেকাংশে দূর হয়েছে। এতে দুর্নীতি ও হয়রানির অবসান হয়েছে। ডিজিটাল সেবার অন্যতম বড় সুবিধা হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ কমে যাওয়া। ফলে ঘুষ, তদবির ও অনিয়মের সুযোগও কমে যায়। সাহেল অ্যাপের মাধ্যমে অধিকাংশ সেবা অনলাইনে সম্পন্ন হওয়ায় সরকারি অফিসে ভিড় কমেছে। সেবা গ্রহণকারীরা এখন আবেদন, অনুমোদন ও নোটিফিকেশনের পুরো প্রক্রিয়া মোবাইল থেকেই পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। কুয়েতের “সাহেল” (Sahel) অ্যাপটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চালু করা হয়। কুয়েত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপটি ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ থেকে নাগরিক ও প্রবাসীদের জন্য কার্যক্রম শুরু করে। শুরুতে এতে মাত্র ১২৩টি সরকারি সেবা ছিল এবং ১৪টি সরকারি সংস্থা যুক্ত ছিল। বর্তমানে এটি বিস্তৃত হয়ে ৪৫০-এর বেশি সেবা এবং কয়েক ডজন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে। কুয়েত সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর কর্মসূচি “নিউ কুয়েত ২০৩৫” বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সাহেল চালু করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল নাগরিক ও প্রবাসীদের সরকারি অফিসে যাতায়াত কমিয়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ সেবা প্রদান করা। একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, ২০২৫ সালের মধ্যে সাহেল অ্যাপের মাধ্যমে ১১১ মিলিয়নেরও বেশি ডিজিটাল লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২.৯ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। মাত্র চার বছরে সাহেল কুয়েতের সরকারি সেবাব্যবস্থায় এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। যে কাজের জন্য একসময় দিনের পর দিন সরকারি অফিসে ঘুরতে হতো, এখন তা কয়েক মিনিটেই মোবাইল ফোনে সম্পন্ন হচ্ছে।
বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে?
বাংলাদেশেও ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ই-পাসপোর্ট, ই-নামজারি, অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর, জাতীয় তথ্য বাতায়নসহ বিভিন্ন সেবা এখন ডিজিটাল মাধ্যমে পাওয়া যায়। এখনও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই সমস্যাটি অন্য জায়গায় বিচ্ছিন্ন সিস্টেম এর মুল কারণ। বাংলাদেশে অধিকাংশ সেবা এখনো বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। ভূমির জন্য এক প্ল্যাটফর্ম, পাসপোর্টের জন্য আরেকটি, কর প্রদানের জন্য আলাদা ব্যবস্থা, আদালত ও পুলিশি সেবার জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে একজন নাগরিককে একাধিক ওয়েবসাইট, অ্যাপ এবং দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত অফিসে উপস্থিত হয়ে কাগজপত্র জমা দিতে হয় এবং দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুই-ই ব্যয় হয়। কুয়েতের মতো “এক অ্যাপে সব সেবা” এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দাপ্তরিক জটিলতাও আছেই। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত অফিসে যেতে হয়, কাগজ জমা দিতে হয় এবং দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। তথ্য সমন্বয়ের অভাবে
একটি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযুক্ত নয়। ফলে একই তথ্য বারবার জমা দিতে হয়। ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই দুর্নীতি ও দালালচক্রের কাছে ধরা দেয়। ডিজিটাল সেবা চালু হলেও অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে কুয়েতের সাহেল মডেল অনুসরণ করে যদি বাংলাদেশ জাতীয় পরিচয়পত্র, ভূমি, পাসপোর্ট, কর, ট্রাফিক, স্বাস্থ্য, আদালত, পুলিশ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এসব সেবা একটি একক অ্যাপে একীভূত করতে পারে, তাহলে কোটি কোটি মানুষের সময়, অর্থ ও হয়রানি কমে যাবে। কুয়েতের সাহেল অ্যাপ ডিজিটাল প্রশাসনের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত যার কারণে সাহেল এখন শুধু একটি মোবাইল অ্যাপ নয়। বাংলাদেশ ডিজিটাল রূপান্তরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলেও নাগরিক সেবার সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম, তথ্যের আন্তঃসংযোগ এবং সেবার সম্পূর্ণ ডিজিটাল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে বাংলাদেশও ভবিষ্যতে “এক অ্যাপে সব সরকারি সেবা” বাস্তবায়ন করতে সক্ষম। কেন প্রয়োজন বাংলাদেশে এমন প্ল্যাটফর্ম। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় পরিচয়পত্র, ভূমি, কর, পাসপোর্ট, পুলিশ, আদালত, স্বাস্থ্য, ট্রাফিক ও সামাজিক নিরাপত্তা সেবাগুলোকে একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে পারলে বাংলাদেশে সেবার মান আমূল পরিবর্তন হতে পারে। এতে শুধু জনগণের ভোগান্তিই কমবে না, বরং সরকারি ব্যয়ও কমবে, বাড়বে স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ এর যাত্রায় বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। তবে স্মার্ট রাষ্ট্র গঠনের জন্য শুধু সেবা ডিজিটাল করলেই হবে না সব সেবাকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে। কুয়েতের সাহেল অ্যাপ দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক সমন্বয় থাকলে কোটি মানুষের জীবন কতটা সহজ করা সম্ভব। আজ কুয়েতের একজন নাগরিক বা প্রবাসী মোবাইল ফোনের কয়েকটি স্পর্শে যে সেবা পাচ্ছেন, বাংলাদেশের মানুষও সেই স্বপ্ন দেখছে। প্রশ্ন হলো সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা আর কতদিন অপেক্ষা করব?
লেখক: মঈন উদ্দিন সরকার সুমন
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব, কুয়েত







Discussion about this post