সাংবাদিকতা একটি পেশা, আবার অনেকের কাছে এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও। বাংলাদেশে যেমন রাজধানীর বাইরের জেলা, উপজেলা ও মফস্বলের অসংখ্য সংবাদকর্মী সাংবাদিকতার পাশাপাশি অন্য পেশা বা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বহু প্রবাসী বাংলাদেশিও তাদের মূল জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি সংবাদ সংগ্রহ, প্রতিবেদন তৈরি এবং প্রবাসীদের নানা সমস্যা তুলে ধরার কাজ করে চলেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রবাসী সংবাদকর্মীদের প্রায়ই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় আপনি তো বিদেশে কাজ করতে এসেছেন, সাংবাদিক না। এমন মন্তব্য অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যেমন আসে, তেমনি কখনো কখনো বিভিন্ন সরকারি দপ্তর বা দূতাবাসের কিছু কর্মকর্তার মুখেও এমন কথা শোনা যায়। প্রশ্ন হলো কোনো ব্যক্তি কি একটি পেশায় নিয়োজিত থাকলে অন্য একটি বৈধ পেশা বা সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না? বাংলাদেশের বাস্তবতা বলছে, সাংবাদিকতা পেশায় কর্মরত সবার আয় এক রকম নয়। দেশের অধিকাংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংবাদকর্মীরা সাংবাদিকতার পাশাপাশি কেউ শিক্ষকতা করেন, কেউ আইন পেশায়, কেউ ব্যবসা করেন, কেউ কৃষিকাজে যুক্ত, আবার কেউ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এসবের পাশাপাশি তারা সংবাদ সংগ্রহ করেন, সংবাদ প্রকাশ করেন এবং জনস্বার্থে কাজ করেন। সমাজও এটিকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছে। একই বাস্তবতা প্রবাসী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা কিংবা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি সংবাদকর্মীদের অধিকাংশই মূলত অন্য কোনো পেশায় কর্মরত। কেউ প্রকৌশলী, কেউ স্বাস্থ্যকর্মী, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ শ্রমিক, কেউ অফিসকর্মী। কিন্তু কর্মঘণ্টার বাইরে তারা প্রবাসী সমাজের সুখ-দুঃখ, সাফল্য, সংকট, শ্রমিক নির্যাতন, দূতাবাসের সেবা, আইনি জটিলতা, রেমিট্যান্স, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ নানা বিষয় দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরেন।এটি কোনো অপরাধ হবার কথা নয় বরং আধুনিক সাংবাদিকতার একটি স্বীকৃত বাস্তবতা। বিশ্বের বহু দেশে “পার্ট-টাইম”, “ফ্রিল্যান্স” এবং “কমিউনিটি জার্নালিজম” দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠিত ধারণা। সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো তথ্যের সত্যতা, নৈতিকতা ও পেশাগত মানদণ্ড; সংবাদকর্মীর প্রধান জীবিকা কী, সেটি নয়। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনসঙ্গত পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার স্বীকৃত। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অবশ্যই এই স্বাধীনতা প্রচলিত আইন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, মানহানি, আদালত অবমাননা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইনি সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু কোথাও এমন কোনো সাধারণ নীতি নেই যে বিদেশে কর্মরত একজন বাংলাদেশি বৈধভাবে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না এমন ধারণা আইনসম্মত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। অবশ্য এটিও সত্য যে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন, অবৈধ সুবিধা নেন, ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন বা পেশাগত নীতিমালা লঙ্ঘন করেন, তাহলে তিনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। এই দায়িত্ব যেমন দেশের সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি প্রবাসী সংবাদকর্মীদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষার প্রথম শর্তই হলো নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহি। অন্যদিকে রাষ্ট্রের বিদেশস্থ মিশনগুলোরও মনে রাখা উচিত, প্রবাসী সংবাদকর্মীরা অনেক সময় প্রবাসীদের সঙ্গে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগসেতু হিসেবে কাজ করেন। দূতাবাসের সেবার ইতিবাচক দিক যেমন তারা তুলে ধরেন, তেমনি প্রবাসীদের ভোগান্তি ও প্রত্যাশাও জনসমক্ষে আনেন। গঠনমূলক সমালোচনা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। তাই প্রবাসী সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং তথ্য আদান-প্রদানের অংশীদার হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। প্রবাসী সংবাদকর্মীদেরও উচিত নিজেদের পেশাগত মান উন্নয়নে সচেষ্ট থাকা। যথাযথ পরিচয়, তথ্য যাচাই, সংবাদ প্রকাশে নৈতিকতা, ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বাংলাদেশের প্রযোজ্য আইন মেনে দায়িত্ব পালন করা। কারণ একজন সংবাদকর্মীর বিশ্বাসযোগ্যতাই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। আজ বিশ্বের কোটি কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির জীবন, সংগ্রাম ও সাফল্যের খবর দেশে পৌঁছে দিচ্ছেন এই প্রবাসী সংবাদকর্মীরাই। তাঁদের কাজ শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়; অনেক সময় মানবিক সহায়তা, সচেতনতা সৃষ্টি, প্রবাসীদের অধিকার রক্ষার দাবিকে সামনে আনা এবং বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরাও। সাংবাদিকতা কোনো ভৌগোলিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি দায়িত্ব, একটি নৈতিক অঙ্গীকার এবং জনস্বার্থে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার। তাই একজন মানুষ বিদেশে জীবিকার জন্য কর্মরত বলেই তাঁর সাংবাদিকতার পরিচয়কে খাটো করা উচিত নয়। বরং তাঁর কাজের মান, সততা ও পেশাগত নীতিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড। প্রবাসী সংবাদকর্মীদের সম্মান রক্ষা মানে কেবল একটি পেশার মর্যাদা রক্ষা নয় বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের কণ্ঠস্বরকে সম্মান জানানো।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতার সাথে প্রবাসী সংবাদকর্মীদের ভূমিকা সত্যিকার অর্থে খুবই কঠিন। প্রবাসী সংবাদকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা আলাদাভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। এসব দেশে সংবাদ প্রকাশ, গণমাধ্যম পরিচালনা, সাংবাদিকতা এবং জনপরিসরে তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে নিজস্ব আইন, লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো রয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্র, জাতীয় নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশে কঠোর বিধান রয়েছে। এই বাস্তবতায় সেখানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি, ভারতীয়, ফিলিপিনো, পাকিস্তানি, নেপালি, শ্রীলঙ্কানসহ বিভিন্ন দেশের সংবাদকর্মীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের আইনকে সম্মান জানিয়ে এবং স্থানীয় বিধিবিধান মেনে নিজ নিজ দেশের প্রবাসী কমিউনির জীবন, সমস্যা ও অর্জনের সংবাদ নিজ দেশের গণমাধ্যমে তুলে ধরেন। প্রশ্ন হলো যদি এই প্রবাসী সংবাদকর্মীরা না থাকতেন, তাহলে বিদেশের মাটিতে বসবাসরত লাখো প্রবাসীর কথা দেশের মানুষ জানত কীভাবে? কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা, ভিসা ও অভিবাসন নীতির পরিবর্তন, দূতাবাসের সেবা, আইনি জটিলতা, রেমিট্যান্স, প্রবাসীদের সাফল্য, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা মানবিক সংকট এসব তথ্য প্রতিদিন দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন মূলত প্রবাসী সংবাদকর্মীরাই। অনেক সময় তাঁদের প্রকাশিত প্রতিবেদনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ কারণেই প্রবাসী সংবাদকর্মীদের কেবল “বিদেশে কর্মরত একজন মানুষ” হিসেবে নয়, বরং প্রবাসী সমাজ ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসেতু হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত। তাঁদের কাজের মূল্য নির্ধারণ হবে সংবাদের সত্যতা, পেশাগত সততা ও জনস্বার্থে অবদানের ভিত্তিতে তাঁদের মূল পেশার ভিত্তিতে নয়।
মঈন উদ্দিন সরকার সুমন
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব, কুয়েত








Discussion about this post