বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিকের জীবন যেন এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বাঁধা। সেই শৃঙ্খলের নাম ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। জন্মের মুহূর্ত থেকে মৃত্যুর পরের আনুষ্ঠানিকতা পর্যন্ত সমাজের নানা স্তরে একজন মানুষকে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে যে সেবা পাওয়ার কথা অধিকার হিসেবে, তা অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হয়েছে দরকষাকষির বিষয়ে। ফলে দুর্নীতি শুধু প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সমস্যা নয় এটি ধীরে ধীরে সামাজিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়েছে। একটি শিশুর জন্মের ঘটনাই ধরা যাক। পরিবারের সদস্যরা যখন নতুন প্রাণের আগমনের আনন্দে উদ্বেল, তখন অনেক ক্ষেত্রেই হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারীর কাছ থেকে ইঙ্গিত আসে মিষ্টি খাওয়ান, কিছু দেন, তাহলে একটু বেশি খেয়াল রাখা যাবে । বিষয়টি হয়তো ছোট বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এটিই অনেক সময় একজন নাগরিকের জীবনে অনিয়মের প্রথম অভিজ্ঞতা। জন্মের সেই মুহূর্তে শুরু হওয়া অনৈতিক প্রত্যাশা যেন পরবর্তী জীবনের জন্য একটি নীরব বার্তা বহন করে কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হবে। শিক্ষাজীবনে প্রবেশের সময়ও একই চিত্র দেখা যায়। একটি ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে গেলে পরিচিত লোক, সুপারিশ কিংবা আর্থিক প্রভাবের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রায়ই শোনা যায়। মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে অনেক সময় প্রভাবশালী পরিচয় বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। ফলে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শেখে যে সমাজে ন্যায়বিচারের চেয়ে ক্ষমতার মূল্য বেশি। এরপর আসে কর্মজীবনের প্রস্তুতি। সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, পরিশ্রম ও মেধার পাশাপাশি অনেক সময় অদৃশ্য একটি শর্ত কাজ করে ঘুষ বা প্রভাব। বহু মেধাবী তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়েও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, আর অন্যদিকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কেউ কেউ এগিয়ে যান। এতে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি হয় না, রাষ্ট্র হারায় তার যোগ্য জনশক্তি। স্বাস্থ্যসেবা খাতেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে, পরীক্ষা করাতে বা দ্রুত সেবা পেতে নানা ধরনের অনৈতিক চাপের সম্মুখীন হন। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়। অথচ চিকিৎসাসেবা একটি মৌলিক অধিকার, কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়। আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। থানায় অভিযোগ দায়ের করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা গ্রহণ পর্যন্ত অনেক সময় ঘুষের অভিযোগ শোনা যায়। একজন সাধারণ নাগরিক যখন ন্যায়বিচার পেতে গিয়ে দুর্নীতির মুখোমুখি হন, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইনের শাসন দুর্বল হলে দুর্নীতিবাজদের সাহস বাড়ে, আর সাধারণ মানুষ নীরব হয়ে যায়। জমি-জমার খতিয়ান, নামজারি, রেজিস্ট্রি, বিদ্যুৎ সংযোগ, ট্রেড লাইসেন্স, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে মানুষকে কখনো না কখনো অনিয়মের মুখোমুখি হতে হয়। অনেকেই সময় বাঁচাতে বা হয়রানি এড়াতে ঘুষ দিতে বাধ্য হন। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে ঘুষ গ্রহণকারী যেমন অপরাধী, ঘুষ প্রদানকারীও কি এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার অংশ নয়? বাস্তবতা হলো, আমরা অনেক সময় নিজেদের অসহায় বলে মনে করি। আমরা বলি আমি তো বাধ্য হয়ে দিয়েছি। কিন্তু এই বাধ্যতার সংস্কৃতিই দুর্নীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। প্রতিবার যখন আমরা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করি, তখন আমরা অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে তুলি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই দুর্নীতির ছায়া মানুষের মৃত্যুর পরও পিছু ছাড়ে না। মৃত্যুসনদ সংগ্রহ, দাফন বা কবরস্থানের ব্যবস্থা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে একজন নাগরিককে ঘুষ ও দুর্নীতির বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথও রয়েছে। পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না এটি আসে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং ব্যক্তিগত সততার মাধ্যমে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের দায়িত্ব নয় এটি নাগরিকদেরও নৈতিক দায়িত্ব। প্রথমত, পরিবার থেকেই সততা ও নৈতিকতার শিক্ষা শুরু করতে হবে। সন্তানদের শেখাতে হবে যে অন্যায়ের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্য কখনো প্রকৃত সাফল্য নয়। দ্বিতীয়ত, সমাজে সৎ ও যোগ্য মানুষদের মূল্যায়ন করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে সম্মানিত করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, অনিয়ম দেখলে নীরব না থেকে প্রতিবাদ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও ঘুষ ও দুর্নীতি একটি গুরুতর অপরাধ। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। (সূরা আর-রাদ, আয়াত: ১১) এই আয়াত আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় শুধু পরিবর্তনের আশা করলেই হবে না, পরিবর্তনের জন্য উদ্যোগও নিতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, নিজের জীবন থেকে অনৈতিক চর্চা দূর করা এবং সমাজে ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলা এসবই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। আজ আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করার সময় এসেছে আমরা কি দুর্নীতিকে নিয়তি হিসেবে মেনে নেব, নাকি এর বিরুদ্ধে দাঁড়াব? একটি জাতির উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে নয়, বরং তার নৈতিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করে। যদি আমরা সত্যিই একটি সুশাসিত, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ চাই, তাহলে ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পরিবর্তন হঠাৎ আসে না, কিন্তু শুরু হয় একজন মানুষের মাধ্যমে। সেই মানুষটি আমি, আপনি, আমরা সবাই। আর যখন একটি জাতি সম্মিলিতভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
লেখক: মঈন উদ্দিন সরকার সুমন
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব, কুয়েত
+96599297830





Discussion about this post