জিসিসির উত্থানের নেপথ্যে ৩৫ মিলিয়ন প্রবাসী নির্মাণশ্রমিক থেকে বিশেষজ্ঞ সবাই মিলে এক অর্থনৈতিক শক্তি। ঝলমলে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, অত্যাধুনিক বিমানবন্দর, বহু লেনের মহাসড়ক, বিশ্বমানের হাসপাতাল ও বিলাসবহুল নগরজীবন গালফ কো অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) অঞ্চলের এই দ্রুত উন্নয়ন যেন এক আধুনিক বিস্ময়। কিন্তু এই দৃশ্যমান সাফল্যের আড়ালে রয়েছে এক বিশাল অদৃশ্য শক্তি প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বিদেশি কর্মী, যাঁদের শ্রম, দক্ষতা ও ত্যাগে দাঁড়িয়ে আছে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি। কুয়েত বাহরাইন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই ছয় দেশ মিলিয়ে প্রায় ৬২ মিলিয়ন মানুষের বাস, যার অর্ধেকেরও বেশি বিদেশি। নির্মাণস্থলের কষ্টকর শ্রম থেকে শুরু করে আধুনিক কর্পোরেট অফিসের কৌশলগত সিদ্ধান্ত প্রবাসীরা জিসিসির অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিটি স্তরেই সক্রিয়। আজ মধ্যপ্রাচ্যের যে শহরগুলো বিশ্বমানের নগরী হিসেবে পরিচিত, সেগুলোর বেশিরভাগ অবকাঠামোই গড়ে উঠেছে প্রবাসী শ্রমিকদের হাত ধরে। তপ্ত মরুভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ ভবন, তেল গ্যাস শিল্পের সহায়ক স্থাপনা, বিশাল বন্দর, শিল্পাঞ্চল সবখানেই প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। শুধু নির্মাণ নয়, পরিচ্ছন্নতা, পরিবহন, নিরাপত্তা, খুচরা ব্যবসা, আতিথেয়তা, স্বাস্থ্যসেবা দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রই বিদেশি কর্মীদের উপর নির্ভরশীল। বিমানবন্দর থেকে হাসপাতাল, অফিস থেকে গৃহস্থালি সবখানেই প্রবাসীদের উপস্থিতি অনিবার্য। জিসিসি অঞ্চলের প্রবাসী জনসংখ্যার বড় অংশই দক্ষিণ এশিয়ার। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা শ্রমিক ও পেশাজীবীরাই সংখ্যায় শীর্ষে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অভিবাসন প্রবাহে নেতৃত্বে দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকরাই বেশি। যেমন ভারতীয় নাগরিক রয়েছে প্রায় ৯.১ মিলিয়ন, বাংলাদেশি প্রায় ৫ মিলিয়ন এবং পাকিস্তানি নাগরিক রয়েছে প্রায় ৪.৯ মিলিয়ন। এছাড়াও মিশর, ফিলিপাইন, ইয়েমেন, নেপাল, সুদান, সিরিয়া ও শ্রীলঙ্কা থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এই অঞ্চলে কর্মরত। তাঁরা শুধু শ্রমশক্তি সরবরাহ করছেন না, বরং বহুসাংস্কৃতিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। দেশভেদে প্রবাসী নির্ভরতার চিত্রে রয়েছে ভিন্ন সংখ্যা। জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে বিদেশি কর্মীর উপস্থিতি কিছু ক্ষেত্রে নাগরিকদের তুলনায়ও অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় রয়েছে।
কুয়েতের পাবলিক অথরিটি ফর সিভিল ইনফরমেশন (পিএসিআই)-এর সর্বশেষ তথ্যমতে দেশটির মোট জনসংখ্যা বর্তমানে ৫.২৩৭ মিলিয়ন। এই জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৩.৬৭ মিলিয়ন প্রবাসী যা মোট জনসংখ্যার ৭১.৫ শতাংশ। যাদের অধিকাংশই ভারত, মিশর, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন ও পাকিস্তান থেকে এসেছেন।
আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে সৌদি আরব ৩৭ মিলিয়ন বাসিন্দার মধ্যে প্রায় ১৬.৪ মিলিয়ন হলেন বিদেশী কর্মী, যারা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন এবং মিশরের জনগোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত। সংযুক্ত আরব আমিরাত জনসংখ্যার ৮৮ শতাংশই প্রবাসী, যাদের মধ্যে ৪৩ লক্ষেরও বেশি ভারতীয়, প্রায় ২০ লক্ষ পাকিস্তানি এবং বাংলাদেশ, ফিলিপাইন ও ইরান থেকে আসা বড় জনগোষ্ঠী রয়েছে। ওমান: জনসংখ্যার ৪১ শতাংশই বিদেশী, যাদের মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশর ও ফিলিপাইন হলো বৃহত্তম প্রবাসী গোষ্ঠী। কাতার: জনসংখ্যার প্রায় ৮৮ শতাংশই প্রবাসী, যার মধ্যে ৭ লক্ষ ভারতীয়, ৪ লক্ষ বাংলাদেশী এবং নেপাল, মিশর ও ফিলিপাইন থেকে আসা উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী রয়েছে। বাহরাইন: জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই প্রবাসী, যাদের মধ্যে ভারতীয়, বাংলাদেশী, পাকিস্তানি, ফিলিপিনো এবং মিশরীয় জনগোষ্ঠী প্রধান। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যেল জিসিসি ভুক্ত দেশগুলোর অর্থনীতি মূলত বহিরাগত শ্রমশক্তির উপর নির্ভরশীল। বিদেশি কর্মীদের ভূমিকা কেবল শ্রমনির্ভর খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকিং, অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, বিমান চলাচল, চিকিৎসা, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং সরকারি পরিষেবায়ও উচ্চ দক্ষ প্রবাসীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে স্থানীয় সমাজের অংশ হয়ে উঠেছেন এবং জ্ঞান স্থানান্তর, উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সংযোগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রবাসী শ্রমের উপর এত বড় নির্ভরতা জিসিসির জন্য একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে সম্ভাব্য ঝুঁকিও। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে যেমন বিদেশি শ্রম অপরিহার্য, তেমনি সামাজিক সংহতি, শ্রম অধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন সরাসরি এই বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করতে পারে যার প্রভাব পড়বে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে। জিসিসি অঞ্চলের উন্নয়নের গল্প আসলে প্রবাসীদের গল্পও। তাঁরা শুধু কর্মী নন তাঁরা এই অঞ্চলের নগরায়ণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। মরুভূমির বুকে গড়ে ওঠা আধুনিক সভ্যতার পেছনে যে অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে, তা হলো লাখো প্রবাসীর ঘাম, শ্রম ও স্বপ্ন। আলো ঝলমলে শহরগুলোর প্রতিটি বাতির পেছনে যেন জ্বলছে তাঁদের নীরব সংগ্রামের গল্প। এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে লাখো প্রবাসী শ্রমিকের ঘাম, কষ্ট আর ত্যাগের গল্প। তপ্ত মরুভূমির রোদে, পরিবার-পরিজন থেকে হাজার মাইল দূরে থেকে, অমানুষিক পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন তাঁরা এই সভ্যতার অবকাঠামো। নিজেদের স্বপ্ন অনেক সময় চাপা পড়ে থাকে, কিন্তু তাঁদের উপার্জিত অর্থে বেঁচে থাকে দেশে থাকা বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান চলে পুরো একটি পরিবার, কখনও পুরো একটি গ্রাম। অকপটে স্বীকার করতেই হবে শুধু তাদের নিজ দেশের ক্ষেত্রেই না প্রবাসী কর্মীরাই মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতির প্রকৃত মেরুদণ্ড। তাঁরা আলোয় থাকেন না, কিন্তু তাঁদের শ্রমেই জ্বলে ওঠে শহরের প্রতিটি আলো। সম্মান ও ভালোবাসা সকল প্রবাসী ভাই-বোনদের প্রতি।
লেখক: মঈন উদ্দিন সরকার সুমন
সভাপতি: বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েত










Discussion about this post