
এক সময়ে কুয়েত ছিল ছোট একটি উপকূলীয় শহর। তখন মসজিদের মাইক্রোফোন, রেডিও বা মোবাইল ফোন ছিল না। তাই সূর্যাস্তের সঠিক সময় সবাইকে জানানোর জন্য এমন একটি পদ্ধতির প্রয়োজন ছিল যা দূর পর্যন্ত শোনা যাবে। কামানের গর্জন সেই কাজটি সহজ করে দেয়। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা মানুষ এই শব্দ শুনেই বুঝতে পারতেন যে ইফতারের সময় হয়ে গেছে। এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ইতিহাস এটি। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, কুয়েতে ইফতার কামানের প্রথা শুরু হয় ১৯০৭ সালে। সে সময় দেশটির শাসক ছিলেন শেখ মুবারক আল সাবাহ। তখন আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা বা সবার কাছে ঘড়ি না থাকায় সূর্যাস্তের সময় মানুষকে জানাতে এই কামান ব্যবহার করা হতো। দেশটির ইতিহাসে উল্লেখ আছে, প্রথম ইফতার কামানটি নিক্ষেপ করেছিলেন আলি বিন আকাব আল-খাজরাজি নামের একজন ব্যক্তি। প্রথম দিকে কামানটি কুয়েত সিটির সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত সেইফ প্যালাস সংলগ্ন স্থান থেকে ছোড়া হতো। পরে শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত নাইফ প্যালাস এলাকায় এটি স্থানান্তর করা হয়। রমজানের বিশেষ আকর্ষণ ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এখন এই নাইফ প্যালাস। বর্তমানে ইফতারের সময় জানার জন্য নানা আধুনিক মাধ্যম থাকলেও এই ঐতিহ্য এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছে কুয়েত। রমজান মাসে প্রতিদিন সূর্যাস্তের আগে সেনা সদস্যরা কামান প্রস্তুত করেন। এরপর আজানের মুহূর্তে এক রাউন্ড কামান নিক্ষেপ করা হয়। এই দৃশ্য দেখতে রমজান মাসে প্রতিদিন ইফতারের কিছু সময় আগে থেকেই নাইফ প্যালাসের আশপাশে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। দেশটির অনেক নাগরিকের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক প্রবাসীও এই ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য দেখতে সেখানে উপস্থিত হন। কুয়েতের এই কামান এখন আর কেবল ইফতারের সময় জানানোর মাধ্যম নয়, এটি দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং রমজানের আবেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কামানের গর্জন শোনার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে উপস্থিত মানুষের মাঝে এক ধরনের আনন্দঘন আবহ তৈরি হয়, যা রমজানের বিশেষ অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে। সূর্যাস্তের মুহূর্তে কামানের গর্জন যেন রোজাদারদের কাছে এক আনন্দের ঘোষণা রোজা ভাঙার সময় এসে গেছে। রমজানের প্রতিদিনের এই ছোট্ট আচার কুয়েতের ইতিহাস, ধর্মীয় চেতনা এবং সামাজিক ঐক্যের একটি জীবন্ত নিদর্শন হয়ে আজও টিকে আছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে অনেকেই সেখানে ছবি তোলেন এবং ভিডিও ধারণ করেন। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। অনেক পরিবার রমজানের সময় সন্তানদের নিয়ে সেখানে যান, যাতে তারা দেশের এই পুরোনো ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে। কুয়েতে বসবাসকারী বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের কাছেও নাইফ প্যালাসের ইফতার কামান একটি বিশেষ আকর্ষণ। অনেকেই রমজানের কোনো একদিন সেখানে গিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেন। অনেকের মতো আমিও একাধিকবার এই ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছি। নাইফ প্যালাসে গিয়ে ইফতারের মুহূর্তে কামানের গর্জন দেখেছি এবং সেই দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সংবাদও করেছি।
রমজানের সেই মুহূর্তে মানুষের অপেক্ষা, কামানের প্রস্তুতি এবং সূর্যাস্তের সাথে সাথে গর্জে ওঠা কামানের দৃশ্য সব মিলিয়ে এটি কুয়েতের একটি অনন্য ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। এক সময় মানুষের কাছে সূর্যাস্তের সময় জানানোর জন্য এই কামান ব্যবহার করা হতো। আজ প্রযুক্তির যুগে তার প্রয়োজন না থাকলেও কুয়েত সরকার এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে রেখেছে। ফলে প্রতি বছর রমজান এলে নাইফ প্যালাসে কামানের গর্জন যেন আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আবেগের এক সুন্দর মিলনস্থল এই ঐতিহ্য।
লেখক: মঈন উদ্দিন সরকার সুমন
সভাপতি: বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েত









Discussion about this post