মঈন উদ্দিন সরকার সুমন: দির্ঘদীন কুয়েতে আছি। এই দেশে পৃথীবির প্রায় সব দেশের জনগন বসবাস করেণ। দেশটিতে নিজ দেশের নাগরিক থেকে প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি। একাধিকবার সুযোগ হয়েছিলো দেশটির নাগরিকদের ঘরে ইফতার করার। চেষ্টা করেছি পাঠকদের জানাতে রমজানের সন্ধ্যায় কুয়েতের রান্নাঘরে ঐতিহ্যের ঘ্রাণ সম্পর্কে। রমজান মাসের ইফতার অর্থ কেবল রোজা ভঙ্গের মুহূর্ত নয় এটি হচ্ছে পরিবার, প্রজাপতি কৌতূহল, আতিথেয়তা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মিলনক্ষেত্র। তৈল সমৃদ্ধ ধনী দেশ কুয়েত। এই দেশে রোজাদাররা ইফতারে বসে যে খাবার খান তাতে খাবারের নানা ভিন্ন স্বাদ, ইতিহাস ও রেওয়াজের সমাহার লক্ষ্য করা যায়। এই মাসে খাবারের প্রস্তুতি, পর্ব এবং সৌন্দর্যই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ইফতার সাধারণভাবে সূর্য ডোবে রোজাদাররা পান ও খেজুর নিয়ে রোজা ভঙ্গ করেন। খেজুর প্রাচীনকাল থেকেই শক্তি সম্পন্ন একটি খাবার হিসেবে এই ঘন্টায় গ্রহণ করা হয় । এটি শরীরকে দ্রুত শক্তি ও পুষ্টি প্রদান করে। এর সাথে প্রায়শই থাকে দই বা লেবান যা পেটকে স্নিগ্ধ করে রাখে। এরপর শুরু হয় আড্ডায় বসা পরিবারের সদস্যদের সাথে বৃহত্তর ইফতার ভোজের আসর। কুয়েতি পরিবারের ইফতার টেবিলে সাধারণত একাধিক ঐতিহ্যবাহী ও পুষ্টিকর খাবার থাকে যা দিনভর রোজার পর শরীর ও মনকে পুনরায় জ্বালানি দেয়। এর মধ্যে মচবুস অন্যতম। এটি কুয়েতের জাতীয় থালার অন্যতম, মচবুস মূলত সুগন্ধি ভাত ও মাংসের মিশ্রণ সাধারণত মুরগি বা দুম্বার মিশ্রণে তৈরি করে। এতে বিভিন্ন মসলা দারুচিনি, এলাচ, শুকনো লেবু স্বাদ মিশে থাকে। এটি ইফতারের মূল খাবারের মতো পরিমাণে পরিবেশিত হয়। থাকে হারিস যা কণ্ঠস্বরহীন কিন্তু হৃদয় ছুঁয়ে যায় এমন খাবার। হারিস হলো গম এবং মাংস ধীরে ধীরে রান্না করে তৈরি একটি পানীয় ধরনের পোরিজ। এর নরম ও ক্রিমি গঠন ইফতারের জন্য খুবই উপযোগী এবং সহজ হজমযোগ্য। আরেকটি হলো জিরিশ চাল ও গমের মিশ্রিত একটি ঘন পোরিজ, সাধারণত মুরগি বা মাংশ দিয়ে তৈরি। ভেজিটেবল, পেঁয়াজ ও মসলার সাথে এটি রান্না করে খাওয়া হয় ফাইবার ও প্রোটিনে ভরপুর থাকে জিরিশে। আরও আছে তাশরীব এটি একটি রিচ স্টু, যেখানে নরম করা রুটি বা নানকে গরম মসলাদার স্টুর ওপর ঢেলে খাওয়া হয়। হালকা ও সহজ হজমীয় হওয়ায় এটি ইফতারের প্রথম কোর্স হিসেবে জনপ্রিয়। আরও আছে এক অনন্য কুয়েতি ঐতিহ্যবাহী খাবার যার নাম আল-কুবূত। ছোট ছোট ডো (গোল টোটা), রান্না করা টমেটো স্যুপ থালাবদ্ধ করে পরিবেশিত হয়। মাঝে মাঝে এর মধ্যে গাজর, আলু বা লুমি যোগ করা হয় ফলস্বরূপ এর স্বাদ মিষ্টি ট্যাংগি থাকে। থাকে নানা ডাল, ডাল সুপ & লেন্টিল সূপ সহ নানা স্বাদকর অভিজাত পানীয়। রোজা ভঙ্গের সাথে তাদের লাগবে ডাল বা লেন্টিল সূপ খাওয়া খুব সাধারণ। এটি হালকা, পুষ্টিকর এবং দ্রুত হজম হয়। লেবান তো আছেই। শরবতের মধ্যে ভিম্টো ও তমারিন্দ জুস এটি রমজান মৌসুমে বিশেষভাবে জনপ্রিয় পানীয়। ভিম্টো আসলে একটি মিষ্টি ফ্রুটি ড্রিংকস, আর তমারিন্দ জুস হালকা টক স্বাদের জন্য প্রিয়। ইফতার পরবর্তী ডেজার্ট হিসেবে নানা মিষ্টান্ন খাবার। এতে খাবারের আনন্দ আরও বাড়ানোর জন্য কুয়েতে বিশেষ মিষ্টান্ন উপস্থাপন করা হয় যা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। লুকাইমাত, গেরস ওগাইলি, বালালীত কতকি নাম।
লুকাইমাত বলতে ছোট গা-ভরা ডো বল, ভাজা এবং চিনি বা খেজুর সিরাপ দিয়ে পরিবেশিত হয় মিষ্টি, কর্কট ও মুখরোচক। গেরস ওগাইলি হলো সাফরান, কার্ডামম ও গোলাপ জল দিয়ে তৈরি একটি ঐতিহ্যবাহী কুয়েতি কেক রমজান এবং ঈদে বিশেষভাবে পরিবেশিত হয়। মিষ্টি ভদকা চাল বা নুডলস উপরে ফেটা দিয়ে পরিবেশিত হয় বালালীত এটি স্ন্যাকস বা হালকা সাইড হিসেবে খাওয়া হয়।
আবার যখন পার্টি হয় তখন আস্ত দোম্বা কিংবা উট এর মসবুচ পরিবেশন করে থাকেন।তাছাড়া কাবাব, টিক্কা, হাম্মুছ, মোতাব্বা আরও কতকি। কুয়েতী নাগরিকদের কাছে ইফতার পরিবার ও সম্প্রদায়ের মিলনের এক সামাজিক অনুষ্ঠান। ইফতার মানেই দুপুরে রোজার ক্লান্তি ভুলে সকলে একত্রে বসে খাবার ভাগাভাগি, কথাবার্তা ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। রোজাদায়ের দীর্ঘ অপেক্ষার পর সূর্যাস্তে এই ভোজনের আনন্দ ধারণ করে কুয়েতি আতিথেয়তার মূল মর্ম বুঝিয়ে দেয়। কুয়েতের ইফতার খাবারগুলো রোজাদারের দেহ ও মনকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য পুষ্টিকর ও সুস্বাদু একদিকে আছে ঐতিহ্যবাহী ভাতীয় ডিশ, অন্যদিকে রয়েছে মিষ্টি ও পানীয় বৈচিত্র্য, যা প্রতিটি ভোজকে স্মরণীয় করে তোলে। প্রাচীন রেওয়াজ থেকে আধুনিক পথ ধরে আজকের ইফতার টেবিল কুয়েত বাসীদের ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার এক অনন্য চিত্র ফুটে উঠে।
লেখক: মঈন উদ্দিন সরকার সুমন
সভাপতি বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েত







Discussion about this post